ত্রিশালে নির্মাণসামগ্রী ডাকাতির মূল রহস্য উদঘাটন: ৫ জেলায় অভিযান ডাকাত চক্রের ৮ সদস্য গ্রেফতার

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় রিজভী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের গুদামে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর নির্মাণসামগ্রী ডাকাতির ঘটনায় আন্তঃজেলা ডাকাত চক্রের ৮ জন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ময়মনসিংহসহ দেশের ৫টি ভিন্ন জেলায় ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে তাদের আটক করা হয়। এ সময় ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত একটি ট্রাক এবং লুট হওয়া মালামালের একটি অংশ উদ্ধার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে আয়োজিত এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ এই চাঞ্চল্যকর তথ্য গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরে।

চাঞ্চল্যকর ডাকাতির পটভূমি ও মামলার বিবরণ
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিট থেকে ২ অক্টোবর রাত ৩টার মধ্যে ত্রিশালের বৈলর মঠবাড়ি বড় পুকুরপাড় এলাকায় অবস্থিত রিজভী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের নির্মাণসামগ্রী সংরক্ষণস্থলে এই দুঃসাহসিক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত দল দুটি ট্রাকে করে এসে প্রতিষ্ঠানের গুদাম থেকে মূল্যবান নির্মাণসামগ্রী ও নগদ অর্থ লুট করে নিয়ে যায়।

লুণ্ঠিত মালামালের তালিকায় ছিল:

৬০০ পিস এম এস পাইপ

১৬০ পিস স্টিল শাটার

১৬০ পিস স্টিল জয়েন্ট

১০টি জানালার গ্রিল

৯টি অ্যান্ড্রয়েড বা বাটন মোবাইল ফোন

নগদ ৩৫ হাজার টাকা

মামলার এজাহার অনুযায়ী, লুট হওয়া সমস্ত মালামাল এবং নগদ অর্থের মোট আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৪৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই ঘটনায় গত ৩ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (অপারেশন) মোঃ মোখছেদুর রহমান বাদী হয়ে ত্রিশাল থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলা গ্রহণের পর থেকেই থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা যৌথভাবে অপরাধীদের শনাক্তে মাঠে নামে।

তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ৫ জেলায় সফল অভিযান
মামলার তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর পুলিশ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে। এর ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ—এই পাঁচ জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে একে একে আটজনকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত আটজন অপরাধীর পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

খবিজল (৩৫) — ইসলামপুর, জামালপুর

সৈকত ওরফে সাখাওয়াত (২৪) — ইসলামপুর, জামালপুর

আবু হানিফ (৩৮) — নান্দাইল, ময়মনসিংহ

উজ্জল মিয়া (২৫) — নান্দাইল, ময়মনসিংহ

সোহেল (২৫) — দুলারহাট, ভোলা

বাদল ওরফে আসলাম (২৮) — মুলাদী, বরিশাল

মাসুদ মিয়া (৩৫) — ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ

ফরিদ হোসেন (৪৫) — রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও

লুণ্ঠিত মালামাল ও ট্রাক উদ্ধার
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত দল বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে লুণ্ঠিত মালামাল ও যানবাহন উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

১. ট্রাক উদ্ধার: গাজীপুর জেলার কোনাবাড়ী থানার নাওজোড় এলাকা থেকে ডাকাতির কাজে সরাসরি ব্যবহৃত একটি ট্রাক জব্দ করা হয়।
২. এমএস পাইপ উদ্ধার: নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা গাউছিয়া এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ‘আরআইসিএল লোহার কোম্পানি’তে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে লুণ্ঠিত ৬ পিস এমএস পাইপ উদ্ধার করা হয়।

রিজভী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মামলার বাদী সশরীরে থানায় এসে উদ্ধারকৃত এই পাইপগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের বক্তব্য ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ
সংবাদ সম্মেলনে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক কলাকৌশল প্রয়োগ করে ময়মনসিংহসহ পাঁচ জেলায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে চক্রের আট সদস্যকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, এই বড় ডাকাতির নেপথ্যে জড়িত অন্যান্য অপরাধীদের পূর্ণাঙ্গ শনাক্তকরণ এবং বাকি লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধে সম্পৃক্ত পলাতক ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে জেলা পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।