যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার দৌড়ে ড. আবদুল আল-সাইয়েদ: ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে মিশিগান

যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রতীক্ষিত ও রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরির মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এবারের নির্বাচনে শীর্ষ পর্যায়ের প্রেসিডেন্ট পদের আলোচনার চেয়েও বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছেন এক সিনেট প্রার্থী। তিনি আর কেউ নন—মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে ইউএস সিনেট আসনের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী ডঃ আবদুল আল-সাইয়েদ। বিজয়ী হলে প্রায় আড়াইশ বছরের মার্কিন উচ্চকক্ষের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে শপথ নেবেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

ডঃ সাইয়েদের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের কড়া নজর ও রাজনৈতিক কৌশল প্রমাণ করে, রিপাবলিকান শিবির তথা সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আসনটি নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন।

কে এই ডঃ আবদুল আল-সাইয়েদ এবং তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার?

রাজনীতিতে নাম লেখানোর আগে ডঃ আবদুল আল-সাইয়েদ ছিলেন একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানজনক ‘রোডস স্কলার’। পেশাগত জীবনে তিনি ডেট্রয়েট হেলথ ডিপার্টমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

একজন প্রগতিশীল নেতা হিসেবে তিনি মূলত সাধারণ মানুষের জীবনের মৌলিক বিষয়গুলোকে নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্ব দিয়েছেন:

  • সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা (Medicare for All): সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি।
  • কর্পোরেট প্রভাবমুক্ত রাজনীতি: রাজনীতিতে বড় বড় কর্পোরেট ফান্ডের অনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা।
  • জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস: সাধারণ কর্মজীবী মানুষের জীবনযাত্রার খরচ কমিয়ে জীবনমান উন্নত করা।

তিনি ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিসেবে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রিপাবলিকান পার্টির হেভিওয়েট প্রার্থী মাইক রজার্স এর বিরুদ্ধে।

নির্বাচনের ঠিক দুই দিন আগে নাটকীয় মোড় ও দলীয় ‘বিশ্বাসঘাতকতা’

নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে মিশিগানের এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে তৈরি হয় চরম নাটকীয়তা। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স হঠাৎ করেই নিজের দলের প্রার্থী আল-সাইয়েদকে ছেড়ে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্ররোচনায় স্টিভেন্সের এই আকস্মিক পদক্ষেপে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরের রাজনীতিতে ঝড় ওঠে এবং দলীয় নেতারা তাঁর তীব্র সমালোচনা করেন।

তবে এই অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা ডঃ সাইয়েদের প্রচারাভিযানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার বদলে উল্টো ইতিবাচক উদ্দীপনা তৈরি করেছে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কেন্দ্রীয় ও জাতীয় নেতৃত্ব সাইয়েদের পক্ষে আরও জোরালোভাবে মাঠে নেমেছেন।

২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ২৪ লাখ ডলার ফান্ড ট্রাস্ট: গণজোয়ারের নতুন রেকর্ড

হ্যালো স্টিভেন্সের সমর্থনের খবরের পর মিশিগানের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। প্রচার শিবিরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর মাত্র এক দিনেই ড. আল-সাইয়েদের নির্বাচনী তহবিলে রেকর্ড ২৪ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান জমা পড়েছে।

ডঃ সাইয়েদের নির্বাচনী প্রচারের মুখপাত্র কোল ওজনিয়াক এক বিবৃতিতে বলেন:

“তৃণমূল পর্যায় থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগৃহীত হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ আবদুল আল-সাইয়েদকে নিয়ে কতটা আশাবাদী। এটি মিশিগানকে দীর্ঘ দিন ধরে পিছিয়ে রাখা পুরোনো দিনের নোংরা রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করার একটি সুস্পষ্ট বার্তা।”

অনুদানের পরিসংখ্যান:

  • মোট দাতা: ৬৫,০০০ এরও বেশি মানুষ।
  • নতুন দাতা: ২৯,৬০২ জন (যারা প্রথমবারের মতো ফান্ডে অর্থ দিলেন)।
  • গড় অনুদান: প্রথক দাতা গড়ে প্রায় ৩৬ ডলার ৭৪ সেন্ট করে দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে এই ফান্ড পুরোটাই এসেছে সাধারণ জনগণের পকেট থেকে, কোনো কর্পোরেট হাউজ থেকে নয়।

মার্কিন কংগ্রেসের বর্তমান আসন বিন্যাস ও আসন লড়াইয়ের গুরুত্ব

মার্কিন রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য এই মধ্যবর্তী নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের রাজনৈতিক অবস্থা নিচে তুলে ধরা হলো:

কক্ষ (Chamber)মোট আসনসংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনরিপাবলিকান আসনডেমোক্র্যাট আসন (+স্বতন্ত্র)
প্রতিনিধি পরিষদ (House)৪৩৫২১৮২১৮২১৪
সিনেট (Senate)১০০৫১৫৩৪৫ (+২)

এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোটগ্রহণ চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, চূড়ান্ত জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে মূলত প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় ৪০টি হাড্ডাহাড্ডি আসনের লড়াইয়ে এবং সিনেটের ১০ থেকে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে—যার মধ্যে অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে মিশিগান।

যদি ডঃ আবদুল আল-সাইয়েদ মিশিগান থেকে জয়ী হতে পারেন, তবে তা শুধু মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানই শক্ত করবে না, বরং আমেরিকার আড়াইশ বছরের সংসদীয় ইতিহাসে যোগ করবে এক নতুন অধ্যায়।