জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ৪,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ: ছাদের বাড়তি বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০.৫০ টাকায় কিনবে সরকার

কুইক রেন্টালের মতো ব্যয়বহুল ও সাময়িক ব্যবস্থার বিপরীতে সাশ্রয়ী ও স্থায়ী পন্থায় দেশের বিদ্যুৎ সংকট দূর করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশকে স্বনির্ভর করতে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে আগামী গ্রীষ্মের আগেই জাতীয় গ্রিডে নতুন করে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে, বাসা-বাড়ি বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ছাদে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পাঠালে সরকার তা প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কিনে নেবে। এই সুবিধা ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বহাল থাকবে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ব্যক্ত করেন।

বিদ্যুৎ খাতের সংকট ও সরকারের মেগা পরিকল্পনা

পূর্ববর্তী সরকারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি নীতিহীনতার কারণে দেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে চরম আমদানি-নির্ভর হয়ে পড়েছিল বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে বৈশ্বিক মন্দা ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের ওপর।

বিদ্যুৎ খাতকে স্থিতিশীল রাখা এবং সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে নেওয়া সরকারের কিছু প্রধান পদক্ষেপে চোখ রাখা যাক:

  • বিশাল ভর্তুকি প্রদান: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতের সংকট সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
  • জ্বালানি ক্রয়ে বরাদ্দ: জ্বালানি তেল আমদানি করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখতে অতিরিক্ত ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
  • বিশেষ অধ্যাদেশ জারি: সৌরবিদ্যুৎ দ্রুত বিস্তার ও সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
  • কাস্টমস ও ট্যাক্স ছাড়: সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনের ওপর শুল্ক-কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।
  • বিশেষ অর্থায়ন: সৌরখাতে সহজে ঋণ ও অর্থায়নের সুবিধার্থে প্রাথমিকভাবে ১,৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে।

‘নেট মিটারিং’ ও ছাদের সোলার ব্যবহারে আকর্ষণীয় অফার

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সাধারণ নাগরিক ও উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করতে সরকার ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থায় বিশেষ জোর দিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিস, কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদ ব্যবহার করার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে।

নিজের ব্যবহারের পর যে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ অবশিষ্ট থাকবে, তা জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করা যাবে। ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকার এই বাড়তি বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে।

“আমি নিজে আমার সরকারি বাসভবনে সোলার প্যানেল বসিয়েছি এবং নিজস্ব প্রয়োজন মিটিয়ে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি।” — প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

কৃষি ও প্রসেসিং সেক্টরে সৌর বিদ্যুতের ব্যাপক ব্যবহার

কৃষকদের সেচ খরচ বহুলাংশে কমিয়ে আনতে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পগুলোকে ধাপে ধাপে সৌরচালিত সেচ পাম্পে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোগ, হিমাগার (Cold Storage) এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে দেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতে যুক্ত হওয়া প্রায় ৮ হাজার সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তরুণ উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্ট-আপ ফান্ড ও বিনিয়োগের আহ্বান

‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’-এ অংশগ্রহণকারী ৩০০-র বেশি তরুণের নতুন উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা ও প্রদর্শিত মডেলের ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্ভাবনী ধারণা যেন অর্থাভাবে ভেস্তে না যায়, সেজন্য চলতি বাজেটে ‘স্টার্ট-আপ’ খাতের জন্য বছরে ৫০০ কোটি টাকা সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়।

প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রবাসী বাংলাদেশি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের নবায়নযোগ্য ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের আহ্বান জানান। পরিশেষে, তিনি দিনের বেলা অপ্রয়োজনীয় বাতি-ফ্যান বন্ধ রেখে অপচয় রোধ করার নাগরিক দায়িত্ব পালনে দেশবাসীর সহযোগিতা চান।