ময়মনসিংহে বিভাগীয় উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভা: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ

বিশেষ প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ:

ময়মনসিংহ বিভাগের চলমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে বিভাগীয় উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এই সমন্বয় সভায় সভাপতিত্ব করেন বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার। সভায় বিভাগের অন্তর্গত সিটি করপোরেশন, পুলিশ, স্বাস্থ্য, সড়ক ও জনপথ এবং কৃষি বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তর তাদের নিজ নিজ কার্যক্রম ও সাম্প্রতিক অগ্রগতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নগর ব্যবস্থাপনায় কঠোর তদারকি

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের (মসিক) প্রতিনিধি সভায় নগর পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপ গুলো উপস্থাপন করেন:

  • মশক নিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ: এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে পরিবেশ দূষণ বন্ধ করতে তদারকি বাড়ানো হয়েছে। নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলা নিশ্চিত করতে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
  • অবৈধ দখল উচ্ছেদ: পথচারীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ফুটপাতে গড়ে ওঠা অবৈধ পার্কিং এবং অস্থায়ী দোকানপাট উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে।

আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে রেঞ্জ পুলিশের তৎপরতা

পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রেঞ্জের আওতাধীন এলাকাগুলোতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:

  • অপরাধ দমনে শূন্য সহনশীলতা: মাদকদ্রব্য, বাল্যবিবাহ, নারীর প্রতি সহিংসতা, অবৈধ বালু উত্তোলন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
  • গোয়েন্দা নজরদারি: সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রোধে ময়মনসিংহ রেঞ্জের অধীনস্থ সব প্রশাসনিক ইউনিট গোয়েন্দা তৎপরতা ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
  • শিশু-কিশোর সুরক্ষা: শিশু-কিশোর নির্যাতন প্রতিরোধ ও ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে পুলিশ।

জনস্বাস্থ্য ও টিকাদান কর্মসূচির আপডেট

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধি সমন্বয় সভায় ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে তাদের গৃহীত উদ্যোগ তুলে ধরেন:

  • ডেঙ্গু মনিটরিং: ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বিতরণ করা হচ্ছে লিফলেট ও পোস্টার।
  • ইপিআই ও হাম টিকাদান: গত ২০ মে বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন শেষ হলেও নিয়মিত ইপিআই (EPI) কর্মসূচির আওতায় শিশুদোক হামের টিকা দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। অতিরিক্ত প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া এলাকায় চলছে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম।

সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন ও কেওয়াটখালী-রহমতপুর সেতু

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সহ বিভাগীয় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গতি আনা হয়েছে:

  • মহাসড়ক দখল মুক্তকরণ: ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ ও শিল্পবর্জ্য ফেলা বন্ধে অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
  • সেতু ও সড়ক নির্মাণ: ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসন করে কেওয়াটখালী সেতু ও রহমতপুর সেতুর নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ময়মনসিংহ-মুক্তাগাছা সড়কের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও নির্বাহি প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কৃষি খাতে পর্যাপ্ত সার ও ‘কৃষক কার্ড’ বাস্তবায়ন

কৃষি বিভাগের পর্যালোচনায় উঠে আসে বিভাগের সার্বিক কৃষি পরিস্থিতি:

  • সার সরবরাহ স্বাভাবিক: বর্তমানে ময়মনসিংহ বিভাগে সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রয়েছে।
  • জৈব সারের প্রচার: মাটির উর্বরতা রক্ষা ও ফলন বাড়াতে ‘ভার্মি কম্পোস্ট’ (কেঁচো সার) ব্যবহারে প্রদর্শনী প্রদর্শনের পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরির কাজ চলছে।
  • কৃষক কার্ড: প্রান্তিক কৃষকদের সুবিধার্থে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আইনি ও প্রশাসনিক বাস্তবায়ন দ্রুত এগিয়ে চলছে।

বিভাগীয় কমিশনারের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা

সভাপতির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেন।

বিভাগীয় কমিশনারের প্রধান বক্তব্য সমূহ:

১. তিন মাসের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান: ডেঙ্গু পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল থাকলেও তা ধরে রাখতে আগামী ৩ মাস সব সরকারি দপ্তর ও আশপাশের এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার বিশেষ নির্দেশ দেন তিনি।

২. ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প বাস্তবায়ন: ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো সরকারের মূল কল্যাণমুখী প্রকল্পগুলো আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বাস্তবায়নের জন্য দপ্তরপ্রধানদের প্রতি আহ্বান জানান।

৩. প্রকল্পের সময়সীমাবদ্ধতা: চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে যেন কোনো বিলম্ব না ঘটে। কোনো সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দেন তিনি।

সভায় উপস্থিতি ও পরিচালনা

সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো: খবিরুল আহসান-এর দক্ষ সঞ্চালনায় উক্ত সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার জন কেনেডি জাম্বিল, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি, বিভাগের চার জেলার (ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনা) জেলা প্রশাসকগণ এবং বিভাগীয় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধান ও প্রতিনিধিবৃন্দ।