
ত্রিশাল প্রতিদিন ডেস্ক:
ত্রিশাল পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের ঐতিহ্যবাহী ‘আহাম্মদ সরকার রোড’ বন্ধের হঠকারী সিদ্ধান্তে স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও হাজারো শিক্ষার্থীর মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকির এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন এলাকাবাসী। প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে ব্যবহৃত এই জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কটি আকস্মিক ভাবে বন্ধের উদ্যোগে ফুঁসে উঠেছে পুরো এলাকাবাসী।
শুক্রবার (১২ জুন) সন্ধ্যায় সড়ক সংলগ্ন এলাকায় আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবীসহ শতাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অংশ নেন। এ সময় তারা যেকোনো মূল্যে বাপ-দাদার আমলের এই রাস্তাটি সচল রাখার দাবি জানান।
১৯৯০ সাল থেকে সচল এই সড়কটি নজরুল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ইসলামী একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজ, ত্রিশাল মহিলা ডিগ্রি কলেজ, আব্বাছিয়া কামিল মাদ্রাসা, সরকারি নজরুল একাডেমি এবং একটি কেজি স্কুলের হাজার হাজার শিক্ষার্থীসহ উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদ সহ শহরে যাতায়তের অন্যতম এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ নিয়মিত চলাচল করেন।
ভোগান্তির মুখে হাজারো মানুষ ও শিক্ষার্থী
সমাবেশে ক্ষুব্ধ বক্তারা বলেন, প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এলাকাবাসী এই সড়কটি ব্যবহার করে আসছেন। কোনো রকম পূর্ব নোটিশ ছাড়া হঠাৎ এটি বন্ধ করে দেওয়া হলে আশপাশের কয়েক হাজার মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত পুরোপুরি থমকে যাবে। বিশেষ করে সড়কটি দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করা দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজারো শিক্ষার্থী, স্থানীয় মসজিদের মুসল্লি ও সাধারণ বাসিন্দারা সরাসরি চরম ভোগান্তির মুখে পড়বেন।
কেন এই বিপর্যয়?
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রশাসন কর্তৃক অপরিকল্পিত পুকুর খনন ও মাছ চাষের কারণেই মূলত রাস্তাটি ভেঙে পড়ে। এখন যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে সড়কটি সচল করার পরিবর্তে, জনস্বার্থকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এটি সম্পূর্ণ বন্ধের যে পাঁয়তারা করা হচ্ছে—যা চরম স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
‘ইউএনও একতরফাভাবে রাস্তা বন্ধ করতে পারেন না’
প্রতিবাদ সভায় স্থানীয় বাসিন্দা আনিছুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এটা আমাদের বাপ-দাদার আমলের রাস্তা। আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি মানুষ এই পথ দিয়ে চলাচল করছে। ইউএনও উনার একতরফা সুবিধার জন্য এই রাস্তা বন্ধ করতে পারেন না, আমরা তা মেনে নেব না। প্রয়োজনে আমরা আরও বৃহত্তর আন্দোলনে যাব।”
পৌরসভার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন সাবেক ছাত্র নেতা মাহফুজুর রহমান কবীর তিনি বলেন, “পৌরসভা একোয়ার (অধিগ্রহণ) করে কোনো রাস্তা করে নাই। মানুষের কাছ থেকে জায়গা নিয়ে এই রাস্তা করা হয়েছে। উনি যদি পৌরসভার দায়িত্ব থেকে (প্রশাসক হিসেবে) এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তবে ভবিষ্যতে পৌরসভার কোনো উন্নয়নের জন্য আর কেউ জায়গা দিতে চাইবে না।”
একই সুরে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ফয়েজ উদ্দিন সরকার প্রশ্ন তোলেন, “এই রাস্তা বন্ধ কইরা দিয়া কেইল্ল্যাগা আরেকটা রাস্তা করুইন লাগে? কেইল্যাগ্যা সরকারি টেহা অপচয় করুইন লাগে? রাস্তা সংলগ্ন দীঘি খনন কইরা মূলত অর্থ আত্মসাৎ করা হইছে।”
পুকুর খনন নাকি ‘সোনার হরিণ’ ও টেন্ডারবাজি?
সমাবেশে ছোট বেলার স্মৃতিচারণ করে স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক আহমেদ, আবু রায়হান ও জাবাদুল হক খান বলেন- যেখানে আমরা ছোট বেলায় সাতার কাটতাম সাধারণ মানুষ গোসল করতো এখন সেখানে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করে জনগণের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি অপ্রয়োজনীয়ভাবে পুকুরটি অতিরিক্ত গভীর করে খনন করায় নতুন পাকা করা সড়কের একটি অংশ হেলে পড়েছে। প্রশাসনের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তারা দাবি করেন, এই পুকুরটি যেন প্রশাসনের কাছে ‘সোনার হরিণ’। নতুন নতুন ইউএনও আসেন আর এই পুকুর ঘিরে নানা প্রকল্প এনে সরকারি টাকা নয়ছয় করেন।
নিরাপত্তার অযুহাত প্রশাসনের
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকি অবশ্য দাবি করেন, সড়কটি বন্ধ নয় বরং এর নকশায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতেই সড়কটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবাসিক এলাকার এই সড়কটিতে নিয়মিত ভারী ও দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছিল। তাছাড়া, সড়কটির একদম পাশেই উপজেলা পরিষদ ও ইউএনও’র সরকারি বাসভবন থাকায় সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে এই নকশা ও চলাচল ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।”
তবে প্রশাসনের এই ‘নিরাপত্তার তত্ত্ব’ মানতে নারাজ স্থানীয়রা। তাদের সাফ কথা— জনস্বার্থ বিঘ্নিত করে কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে ত্রিশালের জনগণকে সাথে নিয়ে রাজপথে কড়া জবাব দেওয়া হবে।
দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি:
জনস্বার্থ উপেক্ষা করে নেওয়া এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল এবং সড়কটি জরুরি সংস্কার করে পুনরায় চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ত্রিশালবাসী। এই বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন এলাকাবাসী।
আপডেটে নিউজ

