
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছে জাতীয় সংসদ ভবন। প্রায় ৩৫ বছরের বিরতির পর আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, যেখানে সংসদ সদস্যরা সরাসরি ভোট দিয়ে বেছে নেবেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতিকে।
এই নির্বাচনে মুখোমুখি হচ্ছেন দুই প্রার্থী — ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, যিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি তথা এলডিপির চেয়ারম্যান।
ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া
সংসদ ভবনের নির্ধারিত কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। ভোট শেষ হওয়া মাত্রই একই স্থানে গণনা কার্যক্রম শুরু হবে এবং ফলাফল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন, যাকে এই নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফল ঘোষণার পর নির্বাচিত ব্যক্তির নামে সরকারি গেজেট প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন।
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ মোতাবেক শুধুমাত্র সংসদ সদস্যরাই এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। জাতীয় সংসদের মোট সদস্য সংখ্যা ৩৫০ হলেও একটি আসন খালি থাকায় এবার ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ জনে।
সাধারণ নির্বাচনের মতো গোপন ব্যালট পদ্ধতি এখানে অনুসরণ করা হচ্ছে না। বরং প্রতিটি ব্যালটে ভোটারের ক্রমিক নম্বর ও পরিচিতি থাকবে এক অংশে, আর অন্য অংশে থাকবে প্রার্থীদের নাম — যেখানে সংসদ সদস্যকে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে হবে। ফলে গোটা প্রক্রিয়াটি হবে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ — কে কাকে ভোট দিলেন, তা উপস্থিত সবার কাছে স্পষ্ট থাকবে।
তিন যুগ আগের শেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা
এর আগে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে, যেখানে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করে বিজয়ী হন। এরপর দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন হয়নি।
দীর্ঘ এই বিরতির কথা স্বীকার করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতায় কিছুটা ঘাটতি থাকলেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং কমিশন এই নির্বাচনকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
মনোনয়ন থেকে চূড়ান্ত লড়াই
গত ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমাদানের দিনে মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল — একটি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে এবং দুটি অলি আহমদের নামে। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার পর প্রতিটি পক্ষের একটি করে মনোনয়নপত্র বৈধতা পায়। প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কোনো প্রার্থীই সরে না দাঁড়ানোয় শেষ পর্যন্ত দুই প্রার্থীর মধ্যেই আজকের ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
কেন এই নির্বাচন প্রয়োজন হলো
গত ২৪ জুলাই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নিজ পদ থেকে পদত্যাগ করার পরই রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়ে পড়ে। সংবিধানের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে নির্বাচন কমিশন। যেহেতু জাতীয় সংসদ তখন নিয়মিত অধিবেশনে ছিল না, তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুসারে বিশেষভাবে সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করা হয়।
রাজনৈতিক সমীকরণ
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর অনুষ্ঠিত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনকে রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন থাকায় দলীয় প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয়ের সম্ভাবনাকেই এগিয়ে রাখছেন বিশ্লেষকরা। তবে একাধিক প্রার্থী থাকায় সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মেনেই সম্পূর্ণ ভোটগ্রহণ ও গণনা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, এই নির্বাচনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য থাকবে, অর্থাৎ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো সংসদ সদস্যের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।
পরবর্তী পদক্ষেপ
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফলাফল ঘোষণা করা হবে এবং নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির নামে দ্রুত সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হবে। এই প্রক্রিয়া অনুযায়ী আগামীকাল শুক্রবার নতুন রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
রাজনৌতিক নানা আলোচনা সমালোচনা বিদ্যমান।পক্ষ বিপক্ষের অভিযোগ অনেকটা তাদের মত করে।একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে যেমন কর্ণেল অলি অন্যদিকে দলীয় মননোয়ন নিয়ে অনেকটা খোশমেজাজে মির্জা সাহেব। অনেক কিছু লিখার থাকলেও চোখ এখন সংসদে।

