
করোনাভাইরাসের বিশ্বব্যাপী তাণ্ডব শুরুর পর থেকে সবার নজর ছিল ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দিকে। বিশ্বজুড়ে গবেষকরা একমত হয়েছিলেন যে, একটি সফল ও কার্যকর ভ্যাকসিনই এই মহামারীর স্থায়ী সমাধান দিতে পারে। সেই ধারাবাহিকতায় ইতিহাসের অভূতপূর্ব দ্রুততায় ভ্যাকসিনের অনুমোদন মেলে এবং বিশ্বজুড়ে শুরু হয় ইতিহাসের বৃহত্তম টিকাদান কর্মসূচি।
ফাইজার, মডার্না, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জনসন অ্যান্ড জনসন, স্পুটনিক-৫ কিংবা চীনের সিনোভ্যাক—বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এসব ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, করোনাভাইরাসের প্রতিনিয়ত রূপ পরিবর্তন বা নতুন ভ্যারিয়েন্টের কারণে এই বিশাল সাফল্যও আজ চ্যালেঞ্জের মুখে।
কেন চিন্তা বাড়াচ্ছে নতুন ভ্যারিয়েন্ট?
করোনাভাইরাসের বিভিন্ন স্ট্রেইন বা ভ্যারিয়েন্ট (যেমন: আলফা, বেটা এবং ডেল্টা) সময়ের সাথে সাথে নিজেদের শক্তিশালী করে তুলেছে। কিছু ভ্যারিয়েন্ট দ্রুত ছড়ায়, কিছু মারাত্মক অসুস্থতা তৈরি করে, আবার কিছু ভ্যারিয়েন্ট ভ্যাকসিনের তৈরি করা সুরক্ষা বলয়কে আংশিক ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
বিশেষ করে ভারতে প্রথম শনাক্ত হওয়া ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বিশ্বজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা মাপা হয় কীভাবে?
ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বুঝতে মূলত দুই ধরনের গবেষণা পরিচালিত হয়:
ইমিউনোলজিক্যাল স্টাডি (Immunological Study): ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম পরিবেশে পরীক্ষা করা হয় যে, ভ্যাকসিন নেওয়ার পর তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় বা প্রশমিত করতে পারছে কিনা।
এপিডেমিওলজিক্যাল বা রিয়েল-লাইফ স্টাডি (Epidemiological / Real-life Study): এটি বেশি গ্রহণযোগ্য। কারণ এখানে ল্যাবের বাইরে বাস্তবে হাজার হাজার ভ্যাকসিন নেওয়া ও না-নেওয়া মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কোন ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর?
গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক জার্নাল (যেমন: New England Journal of Medicine এবং Nature) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ভ্যাকসিনের অবস্থান নিচে তুলে ধরা হলো:
এমআরএনএ ভ্যাকসিন (ফাইজার ও মডার্না): ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ফাইজারের দুই ডোজ প্রায় ৮৮% কার্যকর। অন্যদিকে, বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে মডার্না ভ্যাকসিনের সুরক্ষার মাত্রা ফাইজারের চেয়েও কিছুটা বেশি বা সমমানের।
অ্যাস্ট্রাজেনেকা / কোভিশিল্ড: দুই ডোজ সম্পূর্ণ করার পর অ্যাস্ট্রাজেনেকা ডেল্টার বিরুদ্ধে প্রায় ৬৭% কার্যকর। ভারতের তথ্য অনুযায়ী, এর ভারতীয় সংস্করণ কোভিশিল্ডের কার্যকারিতা সংক্রমণ রোধে প্রায় ৬৩% এবং মারাত্মক রোগ প্রতিরোধে ৮২% পর্যন্ত।
অন্যান্য ভ্যাকসিন (স্পুটনিক-৫, জনসন অ্যান্ড জনসন ও সিনোভ্যাক): সিনোভ্যাক ভ্যাকসিনের সুনির্দিষ্ট ডাটার অভাব রয়েছে এবং কিছু দেশে এর সুরক্ষার হার নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বুস্টার ডোজের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে সার্বিকভাবে সব ভ্যাকসিনই গুরুতর অসুস্থতা ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রতিরোধে ভালো ভূমিকা রাখে।
এক নজরে মূল বার্তা: ভ্যাকসিনের এক ডোজের তুলনায় দুই ডোজ সম্পূর্ণ করা ব্যক্তিরা ডেল্টা বা অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে বহুগুণ বেশি সুরক্ষা পান।
সামনের চ্যালেঞ্জ ও আমাদের করণীয়
ডেল্টা বা অন্যান্য উচ্চ সংক্রমণশীল ভ্যারিয়েন্ট থেকে রক্ষা পেতে শুধু টিকাদানই যথেষ্ট নয়, বরং এর গতি বাড়ানো জরুরি।
টিকাদানের হার বৃদ্ধি: দেশের বড় একটি অংশকে দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে।
কার্যকর তথ্য ব্যবস্থাপনা: জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে ভ্যাকসিনের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের সঠিক তথ্য ডাটাবেজে সংরক্ষণ করতে হবে।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা: ভাইরাসের রূপ পরিবর্তনের গতির সাথে টিকাদানের গতি মেলাতে না পারলে মাস্ক পরা, হাত ধোয়া এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিকল্প নেই।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ওয়েল কর্নেল মেডিকেল কলেজ, দোহা, কাতার
তথ্যসূত্র-প্রথম আলো

