
নিজস্ব প্রতিবেদক: উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও আইনি আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে অবাধে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের চররামমোহন সংলগ্ন বটতলা এলাকায় ড্রেজার, বড় কার্গো ও বোরিং পদ্ধতির মাধ্যমে দিন-রাত বালু তোলার মহোৎসব চলছে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো—যে ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে একসময় মহামান্য হাইকোর্ট এই ঘাটে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেই এখন একটি চক্র গড়ে তুলে বালু সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রক বনে গেছেন। ফলে নদের তীরবর্তী সরকারি কোটি টাকার জিও ব্যাগ বেড়িবাঁধ, বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও সামগ্রিক পরিবেশ চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
রিটকারীর নেতৃত্বে ক্ষমতার পালাবদলে আইন অমান্য
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সালের ২২শে জুন উজানচরণও পাড়ার আব্দুল কাদিরের ছেলে রফিকুল ইসলামের আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট (রীট পিটিশন নং-১৬৬/২০২০) ঈশ্বরগঞ্জের উচাখিলা বটতলা বালুঘাট থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবের পালাবদলে পরিস্থিতি উল্টে যায়।
যে রফিকুল ইসলাম আদালতের দ্বারস্থ হয়ে নিষেধাজ্ঞা এনেছিলেন, বর্তমানে তিনিই স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে আঁতাত করে নদীর বুক খালি করছেন। রাজিবপুরের রুহুল আমিনের ছেলে মোঃ কামাল হোসেন, মোঃ আল মামুন, রজব আলীর ছেলে মোঃ ফরিদ মিয়া, মোঃ মারফত আলীর ছেলে মোঃ জাহেদ আলী, মোঃ শামছুদ্দিনের ছেলে মোঃ আল আমিন, হাসেম মাষ্টারের ছেলে মোঃ রিপন মিয়া, হাসমত আলীর ছেলে ইসরাফিল মিয়া, উচাখিলার আহাম্মদ আলীর ছেলে মোঃ হাবিবুর রহমান হবি এবং চরআলগির উছমান আলীর ছেলে মোঃ রতন গংদের সঙ্গে নিয়ে হাইকোর্টের আদেশে বন্ধ থাকা সেই ঘাট থেকেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অবৈধ বালু ড্রেজারে তোলা হচ্ছে।
বিপন্ন বেড়িবাঁধ ও পরিবেশ: ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
বটতলা নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যারাতি থেকে শুরু করে সারারাত ড্রেজার ও কার্গো নামিয়ে বালু তোলা হয়। এতে নদী ভাঙন রোধে সরকার নির্মিত জিও ব্যাগের বেড়িবাঁধ ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদী ভাঙনে বসতবাড়ি ও কৃষি জমি বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় ঘুম হারাম হয়ে গেছে স্থানীয়দের।
চলতি অর্থবছরে ঈশ্বরগঞ্জ বা ময়মনসিংহ জেলার কোথাও কোনো বৈধ ‘বালুমহাল’ ঘোষণা না থাকা সত্ত্বেও এমন প্রকাশ্য কাণ্ড কীভাবে চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিষয়টি বারবার প্রশাসনকে জানানোর পরও কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় তাদের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে নানা কানাঘোষা চলছে। আইনকে এভাবে খেলার পুতুল বানিয়ে নিজেদের আখের গোছানোর ঘটনায় রফিকুল ইসলামসহ পুরো চক্রটির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
প্রসাশনের কঠোর বার্তা: আইনি ব্যবস্থা ও নিয়মিত মামলার নির্দেশ
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের পক্ষে ‘মিজান’ নামের এক ব্যক্তি ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আজিম উদ্দিন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলার কোথাও বালুমহালের কোনো অস্তিত্ব বা অনুমোদন নেই। অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখা হবে।” তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগটি আমলে নিয়ে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
নির্দেশনা পাওয়ার পর ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সানজিদা রহমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: রিয়াদ হোসেনকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। একইসাথে আদালতের নির্দেশ অমান্য করে জালিয়াতি ও বেআইনি বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরাসরি নিয়মিত মামলা দায়েরের নির্দেশনা প্রদান করেন তিনি।

