মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ধাক্কা: তেহরানের রাজপথে হাজারো মানুষের উল্লাস ও ভূ-রাজনীতির নতুন হিসাব

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ধাক্কা: তেহরানের রাজপথে হাজারো মানুষের উল্লাস

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দেশটিতে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ইরান সংঘাত, জীবনযাত্রার চড়া ব্যয় এবং বারবার শুল্ক নীতি পরিবর্তনের কারণে মার্কিন ভোটাররা রিপাবলিকানদের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেন। ওয়াশিংটনের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পরদিনই ইরানের রাজধানী তেহরানে সাবেক মার্কিন দূতাবাসের সামনে উদযাপিত হলো এক বিশাল বার্ষিক সমাবেশ, যেখানে ফুটে উঠেছে আমেরিকার এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া।

তেহরানের রাজপথে অ্যান্টি-আমেরিকা সমাবেশ ও প্রতিক্রিয়া

১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক জিম্মি ঘটনার স্মৃতি স্মরণে আয়োজিত এই বার্ষিক সমাবেশে সমবেত হয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন হাজার হাজার ইরানি। সমাবেশে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ এবং ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে তেহরানের কেন্দ্রস্থল। বিক্ষোভকারীরা ইরানের জাতীয় পতাকা নাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করে বিভিন্ন ব্যানার ও চিত্র প্রদর্শন করেন।

প্রদর্শিত ব্যানারগুলোতে নানা প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়। একটি বিশাল ব্যানারে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে কটাক্ষ করার পাশাপাশি নিহত সাবেক শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দর বৃদ্ধির প্রভাবে বিশ্ব মানচিত্রের প্রেক্ষাপটে প্রতীকী উপস্থাপনাও দেখা যায়।

জ্বালানি সংকট ও মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের রায়

সমাবেশে অংশ নেওয়া সাধারণ ইরানিদের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণই রিপাবলিকানদের এই হারের পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

  • আন্তর্জাতিক চাপ ও বৈশ্বিক প্রভাব: বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব এবং ওয়াশিংটনের পাল্টা নৌ-অবরোধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পায়।

  • ভোটের ওপর প্রভাব: তেহরানের বাসিন্দাদের মতে, তেলের এই চড়া দাম সরাসরি আমেরিকানদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলেছে, যা পরবর্তীতে ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিক্ষোভকারীরা জানান, বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া ইরানের জনগণ যে কষ্ট সহ্য করে আসছে, তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পশ্চিমা বিশ্বের জনগণও এখন সেই দুর্ভোগের কিছুটা মুখোমুখি হচ্ছে।

‘যুদ্ধকে না’: মার্কিন রায় ও তেহরানের অফিশিয়াল অবস্থান

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের পর তেহরানের পক্ষ থেকে প্রথম অফিশিয়াল واکنش হিসেবে মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য তুলে ধরেন। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনার অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গালিবাফ উল্লেখ করেন যে, জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত খরচ ও সচেতনতার দরুন মার্কিন জনগণ যুদ্ধের বিরুদ্ধে বার্তা দিয়েছে। তেহরান তাদের এই রায়কে স্বাগত জানায়।

তবে কূটনীতিক পর্যায়ে স্থায়ী শান্তির আলোচনা চললেও, পুনরায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় এ প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতির লক্ষণ মেলেনি।

হোয়াইট হাউসের ক্ষমতা বদল নিয়ে সাধারণ ইরানিদের সংশয়

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দল পরিবর্তন হলেও তা ইরানের বাস্তব পরিস্থিতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে—এ নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে সাধারণ ইরানিদের মনে।

  • দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানা পোড়েন: ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর মার্কিন দূতাবাসে টানা ৪৪৪ দিন জিম্মি দশা এবং পরবর্তী ১৯৮০ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক বৈরী।

  • রাজনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি: অনেক ইরানির মতে, ওয়াশিংটনে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান—যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, গত পাঁচ দশক ধরে ইরানের প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।

মূল ঘটনার ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট

১৯৭৯ সালের নভেম্বরে তৎকালীন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মার্কিন সমর্থিত সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত শাহকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিতে তেহরানের মার্কিন দূতাবাস ঘেরাও করে ৫২ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করেই প্রতি বছর তেহরানে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। প্রতি বছরই এটি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীকী দিন হিসেবে ইরানের সরকারি ও সামাজিক স্তরে পালন করা হয়ে থাকে।