ময়মনসিংহে ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে বিধবার টিপসই নিয়ে জালিয়াতি: ভুয়া কাবিননামা তৈরির অভিযোগ

ফুলবাড়ীয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:
সরকারি সুবিধা বা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ করে দেওয়ার কথা বলে এক অসহায় বিধবা নারীর সরলতার সুযোগ নিয়ে ভুয়া এফিডেভিট ও কাবিননামা তৈরির এক ন্যাক্কারজনক অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায়। প্রতারণার শিকার ওই নারী নিজের সামাজিক সম্মান রক্ষা ও জড়িতদের শাস্তির দাবিতে স্থানীয় মসজিদ কমিটি ও প্রবীণ বিচারকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

ফ্যামিলি কার্ডের নামে এনআইডি ও টিপসই সংগ্রহ

ভুক্তভোগী নারী উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামের মোছাম্মৎ আছিয়া বেগম (৪৩)। প্রায় এক যুগ আগে স্বামী হারানো আছিয়া বেগম পাঁচ সন্তানকে কষ্ট করে লালন-পালন করেছেন। ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি নিয়ে গঠিত তার সংসারে বিভিন্ন সময় বিয়ের প্রস্তাব আসলেও তিনি তা নাকচ করে দেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার বছর আগে মেজো ছেলের বিয়ের সময় প্রতিবেশী প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল কুদ্দুছকে (৬২) উকিল শ্বশুর বানানো হয়। আত্মীয়তার সুবাদে তিনি আছিয়া বেগমের বাড়িতে আসা- যাওয়া করতেন এবং স্থানীয় আব্দুছ ছাত্তার নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে একাধিকবার আছিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। প্রতিবারই আছিয়া বেগম তা প্রত্যাখ্যান করেন।a(
পরবর্তীতে মাস দেড়েক আগে আব্দুস ছাত্তার বর্তমান সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বানিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আছিয়া বেগমের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ফটোকপি ও ছবি নেন। এর কিছুদিন পর কৌশল অবলম্বন করে নিজের দোকানে ডেকে নিয়ে একটি খাতায় তার কাছ থেকে দুটি টিপসই নেওয়া হয়।

ভুয়া কাবিননামা প্রকাশ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

সম্প্রতি আব্দুস ছাত্তার এলাকায় রটিয়ে দেন যে, বিধবা আছিয়া বেগম ও প্রতিবেশী আব্দুল কুদ্দুছ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। প্রমান হিসেবে তিনি একটি এফিডেভিট ও কাবিননামার কাগজ প্রদর্শন করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ফুলবাড়ীয়া পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী অফিসের সিলযুক্ত ওই কাবিননামায় আড়াই লাখ টাকা দেনমোহর এবং ৫০ হাজার টাকা উসুল দেখানো হয়েছে। কাবিননামায় সাক্ষী হিসেবে আব্দুল মান্নান ও সাইফুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তির নাম ব্যবহার করা হলেও তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন। অভিযোগে প্রকাশ, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আব্দুস ছাত্তার ও তার সহযোগী আব্দুল হেকিম মাস্টার এই জালিয়াতির পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন।

বিচার চেয়ে গ্রাম্য সালিশ

বিষয়টি জানতে পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ভুক্তভোগী আছিয়া বেগম। তিনি বলেন, “আমার বড় বড় ছেলে, বৌমা ও নাতি-নাতনি রয়েছে। এই বয়সে এমন মিথ্যা রটনায় আমি সমাজে মুখ দেখাতে পারছি না। কার্ডের কথা বলে ছাত্তার আমার টিপসই নিয়ে এই জালিয়াতি করেছে। আমি এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

ঘটনার বিচার চেয়ে আছিয়া বেগম স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও পরিচালনা কমিটির কাছে আবেদন জানান। এর প্রেক্ষিতে গত সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় পাটুলী গ্রামে এক সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সালিশে ভুক্তভোগী নারী সমস্ত ঘটনা তুলে ধরলেও প্রধান অভিযুক্ত আব্দুস ছাত্তার অনুপস্থিত থাকেন। ফলে আগামী বুধবার (৭ অক্টোবর) পুনরায় সালিশের দিন ধার্য করা হয়েছে।

অভিযুক্ত ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে আব্দুস ছাত্তার ‘পরে কথা বলবেন’ বলে সংযোগ কেটে দেন এবং পরবর্তীতে আর ফোন ধরেননি। অপর অভিযুক্ত আব্দুল কুদ্দুসের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্টার মো. গোলাম মোস্তফা জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তার নাম, সিল ও স্বাক্ষর জাল করে এই ভুয়া কাবিননামা তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে; এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না।

আইনি ব্যবস্থা ও প্রশাসনের আশ্বাস

ফুলবাড়ীয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদুল হাসান জানান, “ঘটনাটি সম্পর্কে এখনো লিখিত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

অন্যদিকে, ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শহীদুল ইসলাম সোহাগ এ ঘটনাকে ন্যাক্কারজনক ও অত্যন্ত দুঃখজনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ভুক্তভোগী নারীকে তার সম্মানহানি ও প্রতারণার বিষয়ে দ্রুত লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।