
বিশেষ প্রতিনিধি | ময়মনসিংহে চাঞ্চল্যকর শিশু হত্যা মামলা
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে দুই বছরের অবোধ শিশু ওয়াসকুরুনিকে বিষ খাইয়ে নৃসংসভাবে হত্যার ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি, শিশুটির সৎ মা আকলিমা খাতুন নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন। আদালতের বিচারকের সামনে জবানবন্দি দিয়ে তিনি জানান, তিনিই শিশুটিকে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছেন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ময়মনসিংহের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিনা আক্তার তমার আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এই জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। একই মামলায় শিশুটির বাবা আব্দুল কাদিরকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ।
ঘটনার পটভূমি ও পারিবারিক অন্তর্দ্বন্দ্ব
স্থানীয় ও মামলার নথিসূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সূচনা হয় পারিবারিক বিরোধ ও দাম্পত্য কলহকে কেন্দ্র করে। ২০১৫ সালে উপজেলার বোকাইনগর ইউনিয়নের বীরপুর দত্তবাড়ি গ্রামের আব্দুল কাদিরের সঙ্গে মইলাকান্দা ইউনিয়নের শেফালী আক্তারের বিয়ে হয়। এই দম্পতির ঘরে জয়নাল আবেদীন (৮) ও ওয়াসকুরুনি (২) নামে দুই সন্তান জন্ম নেয়।
তবে দীর্ঘদিনের পারিবারিক মনমালিন্যের জেরে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তাদের আইনি বিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় আব্দুল কাদির কাশিমপুর গ্রামের আকলিমাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে ঘরে তোলেন। এর পর থেকে প্রথম পক্ষের দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কাদির ও আকলিমা একই সঙ্গে বসবাস করছিলেন।
সাবেক স্ত্রী শেফালী আক্তারের অভিযোগ, আকলিমার সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কের কারণেই তাকে অকারণে তালাক দেওয়া হয়েছিল। এর পর থেকেই সৎ মা আকলিমা শিশু দুটির প্রতি বৈরী আচরণ শুরু করেন।
যেভাবে ঘটে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড
গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে বোকাইনগর ইউনিয়নের বীরপুর দত্তবাড়ি গ্রামে এই নির্মম ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার দিন দুপুরে আকলিমা দুই বছরের শিশু ওয়াসকুরুনিকে ডিম ও পানি খাওয়ায়। এরপর গোসল করিয়ে তাকে ঘুম পাড়ানোর উদ্দেশ্যে বিছানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটি প্রচণ্ডভাবে কাশতে শুরু করে। কাশির শব্দ পেয়ে শিশুটির দাদি আছিয়া আক্তার দ্রুত ঘরে ছুটে আসেন এবং শিশুটির মুখ থেকে বিষের প্রখর গন্ধ পান। দ্রুত তাকে প্রথমে গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবোধ শিশুটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
পুলিশের অভিযান ও আসামিদের গ্রেফতার
শিশুটির মৃত্যুর খবর পেয়ে তার জন্মদাত্রী মা মোছা. শেফালী আক্তার গত বুধবার (৭ অক্টোবর) গৌরীপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি প্রাক্তণ স্বামী আব্দুল কাদির ও সৎ মা আকলিমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বিষপ্রয়োগে শিশু হত্যার অভিযোগ আনেন।
অভিযোগ পাওয়ার পরপরই বৃহস্পতিবার বিকেলে গৌরীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে এক বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। বীরপুর দত্তবাড়ি গ্রাম থেকে অভিযুক্ত সৎ মা আকলিমা ও বাবা আব্দুল কাদিরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই রাতেই লিখিত অভিযোগটি নিয়মিত হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।
আদালতে স্বীকারোক্তি ও আইনি পদক্ষেপ
গ্রেফতারকৃত দুই আসামিকে শুক্রবার আদালতে সোপর্দ করা হলে সৎ মা আকলিমা বিচারকের কাছে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন, “সৎ মা আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল রহস্য ও বাবার ভূমিকা উদ্ঘাটনে আব্দুল কাদিরকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। আগামী রোববার (১১ অক্টোবর) রিমান্ড আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।”
গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান জানান, আসামিদের আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং ঘটনাটি গভীরতার সাথে তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে, সন্তানের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে মা শেফালী বলেন, “আমাকে না জানিয়ে সৎ মাকে আসল মা বানিয়ে তারা হাসপাতাল থেকে ছেলের মরদেহ চুরি করে এনেছিল। আমি আমার নিষ্পাপ সন্তান হত্যার সর্বোচ্চ বিচার চাই।”

