
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দলের আত্মগোপনে থাকা ও কারাবন্দী নেতাকর্মীদের খোঁজ না নিয়ে উল্টো কমিটি ভাঙা, নতুন কমিটি গঠন এবং আর্থিক লেনদেন বা ‘কমিটি বাণিজ্য’র অভিযোগ উঠেছে উপজেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ফেসবুক পোস্ট ও ডঃ ইউনূসের বক্তব্য শেয়ার
দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর ত্রিশাল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইকবাল হোসেনের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি পুনরায় সচল হলে সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বক্তব্য শেয়ার করা হয়—যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় নানা গুঞ্জন।
এ বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন দাবি করেন, তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে হ্যাক বা অপব্যবহার করা হয়েছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ নেন এবং ওই পোস্ট তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ বা অবস্থানের সঙ্গে কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয় বলে স্পষ্ট করেন।
বিলাসবহুল বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক
গত ৩১ মে ত্রিশাল পৌরশহরের নজরুল অডিটোরিয়ামে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালামের দুই মেয়ের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের আয়োজন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সে সময় দলের বহু নেতাকর্মী হামলা-মামলার ভয়ে আত্মগোপনে বা কারাবন্দী ছিলেন। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে সহস্রাধিক অতিথির উপস্থিতিতে এই জমকালো অনুষ্ঠান করা নিয়ে তৃণমূলের অনেকে প্রশ্ন তোলেন।
তবে সভাপতি আবুল কালাম দাবি করেছেন, এটি ছিল তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের পূর্বনির্ধারিত একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান, যার সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই।
কারাবন্দী ও পলাতক নেতাদের বাদ দিয়ে কমিটি ভাঙার অভিযোগ
তৃণমূলের অভিযোগের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে ইউনিয়ন পর্যায়ের চলমান কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ বাদল দীর্ঘদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে ছিলেন। এমনকি তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তাঁর ছেলেও একাধিক মামলায় কারাবন্দী। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর অবর্তমানে ইউনিয়ন কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়।
একইভাবে হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ কারাগারে থাকা অবস্থায় ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নেতাকর্মীদের দাবি, দুর্দিনে পাশে না দাঁড়িয়ে এমন সিদ্ধান্ত দলীয় গঠনতন্ত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপ ও ফেসবুকে চলছে তুমুল বিতর্ক।
তৃণমূলের ক্ষোভ ও হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ
উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা সুহেল মাহমুদ সুমন তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, দুঃসময়ে শত শত নেতাকর্মী কারাবন্দী বা পলাতক থাকলেও উপজেলা নেতারা তাদের খোঁজ নেননি। উল্টো নিজেদের স্বার্থরক্ষায় বিএনপিসহ বিভিন্ন মহলের সঙ্গে আঁতাত করে এলাকায় ব্যবসা ও কমিটি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। কঠিন এই সময়ে তৃণমূলের পাশে দাঁড়াতে দলের হাইকমান্ডের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।
বালিপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ বাদল বলেন, “৫ আগস্টের পর আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে হামলা হয়েছে। দীর্ঘ সময় কারাবাস শেষে জামিনে মুক্ত হয়েছি, আমার ছেলেও এখনো জেলে। এই দুঃসময়ে দল থেকে ন্যূনতম সহযোগিতা তো দূরের কথা, উল্টো কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। দল যাকে যোগ্য মনে করবে দায়িত্ব দেবে, এতে আপত্তি নেই; তবে দুর্দিনে দলীয়ভাবে পাশে না দাঁড়ানোটা খুবই কষ্টদায়ক।”
এদিকে ত্রিশাল পৌরসভা ও বইলর ইউনিয়ন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে ওঠা আর্থিক লেনদেন বা ‘কমিটি বাণিজ্যের’ অভিযোগের বিষিয়ে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ নেতাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

