গৌরীপুরে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহে অনিয়ম: খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এলএসডি) আলাল হোসেন
গৌরীপুর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এলএসডি) আলাল হোসেন

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এলএসডি) আলাল হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে ধান ও চাল সংগ্রহের নামে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। চলতি আমন ও বোরো মৌসুমে নানা দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে ভুক্তভোগী কৃষক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

কৃষকদের হয়রানি ও উৎকোচ দাবি

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আমন ধান সংগ্রহের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় গুটিকয়েক সাধারণ কৃষকের কাছ থেকে ধান নেওয়া হলেও তাদের বিল আটকে রাখা হচ্ছে। প্রতি মণ ধানে অতিরিক্ত ২ কেজি ধান এবং কার্ডপ্রতি ৫০০ টাকা করে ঘুষ দাবি করছেন এই কর্মকর্তা। ঘুষের টাকা না দিলে সাধারণ কৃষকদের বিল আটকে রেখে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলার অচিন্তপুর ইউনিয়নের কৃষক হাতেম আলী জানান, তিনি খাদ্য গুদামে ধান নিয়ে গেলে গুদামে জায়গা এবং বস্তা সংকট দেখিয়ে তার ধান ফেরত দেওয়া হয়। একইভাবে মাওহা ইউনিয়নের কৃষক মোশাররফ হোসেনও ধান বিক্রি করতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছেন। অথচ প্রভাবশালী ও সিন্ডিকেটের ধান ঠিকই গুদামে নেওয়া হচ্ছে।

কাগজে-কলমে ধান ক্রয় ও রাইস মিল সিন্ডিকেট

প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করে স্থানীয় চালকল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সাথে যোগসাজশে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে। নামমাত্র ৫-৭ টন ধান কৃষক থেকে কিনে কাগজে-কলমে ৫০-৬০ টন দেখানো হচ্ছে।

পরবর্তীতে অটো রাইস মিলের মালিকদের সাথে আঁতাত করে ভুয়া ক্রাশিং বা ছাঁটাই দেখিয়ে সরকারি ফান্ড থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রাশিং আদেশ জারির পূর্ব ও পরবর্তী খাদ্য গুদামের সাপ্তাহিক সংগ্রহের হিসাব পরীক্ষা করলেই এই অনিয়মের সত্যতা মিলবে।

বদলি বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি খাদ্য গুদামে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (এলএসডি) দায়িত্ব পেতে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়ে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, আলাল হোসেনও মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে চার কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে এই পদে পোস্টিং নেন। পদায়নের পর সেই টাকা তুলতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন।

গৌরীপুর এলএসডিতে যোগদানের পর গুদামে থাকা উচ্চমানের চাল বাইরে বেশি দামে বিক্রি করে নিম্নমানের চাল গুদামজাত করার প্রাথমিক অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া সরকারি খালি বস্তা খোলা বাজারে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও প্রতিক্রিয়া

শুধু গৌরীপুর নয়, ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা ও শ্যামগঞ্জ এলএসডিতেও ধান-চাল সংগ্রহে একই ধরনের অনিয়মের খবর পাওয়া গেছে। এর আগে পার্শ্ববর্তী নেত্রকোনার মদন উপজেলায় দুর্নীতির অভিযোগে দুই খাদ্য কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

অভিযোগের বিষয়ে গৌরীপুর এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলাল হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং এগুলোকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।

তবে স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল বিষয়টির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।