ময়মনসিংহে ড্রামবন্দি লাশ উদ্ধার: ব্ল্যাকমেইলিংয়ের জেরে স্বর্ণকার হত্যা, প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

mymensingh
ঘটনার প্রধান পরিকল্পনাকারী ও মূল অভিযুক্ত শামীম মিয়াকে (৩৮) গ্রেপ্তার করা

আরিফ রব্বানী, ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহের বেগুনবাড়ী স্লুইসগেট এলাকায় ড্রামের ভেতর বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া স্বর্ণকার নিরঞ্জন ধর (৫৪) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রধান পরিকল্পনাকারী ও মূল অভিযুক্ত শামীম মিয়াকে (৩৮) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আজ রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ময়মনসিংহের পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মিজানুর রহমান।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত ও লাশ উদ্ধার

নিহত নিরঞ্জন ধর পেশায় একজন স্বর্ণকার ছিলেন এবং পাশাপাশি চারটি অটোরিকশার মালিক ছিলেন। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে বেগুনবাড়ী স্লুইসগেট এলাকায় পানির নিচে ডুবন্ত একটি প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর থেকে চটের বস্তায় মোড়ানো অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

মরদেহের ছবি পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নিখোঁজ নিরঞ্জন ধরের পরিবার তাকে শনাক্ত করে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সবিতা রানী ধর বাদী হয়ে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে পিবিআই নিজ উদ্যোগে এর তদন্তভার গ্রহণ করে।

গাজীপুর থেকে আসামি গ্রেপ্তার

পিবিআই সূত্র জানায়, ঘটনার পর থেকেই ময়মনসিংহ পিবিআইয়ের একটি বিশেষ দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় গত ২৬ সেপ্টেম্বর দিবাগত গভীর রাতে (রাত ১২:৩০ মিনিট) গাজীপুরের গাছা থানার বোর্ডবাজার বটতলা এলাকার সর্দার মার্কেট থেকে শামীম মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। শামীম সেখানে তাঁর শ্যালক মাসুদ রানার ভাড়া বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ

পিবিআইয়ের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, নিহত নিরঞ্জন ধরের অটোরিকশাগুলো ময়মনসিংহের খাগডহর এলাকার ‘সততা গ্যারেজে’ রাখা হতো। শামীম ওই গ্যারেজের ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এই সূত্রে দুজনের মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং নিরঞ্জন নিয়মিত শামীমের ভাড়া বাসায় যাতায়াত করতেন।

তদন্তকারীদের মতে, পারিবারিক অনুপস্থিতির সুযোগে শামীম তাঁর বাসায় এক নারীকে এনে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতেন। একদিন অসাবধানতাবশত নিরঞ্জন ধর ওই অনৈতিক দৃশ্য বা অপরাধের ভিডিও ধারণ করেন। পরবর্তীতে ওই ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তিনি শামীমকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন এবং মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।

যেভাবে ঘটানো হয় হত্যাকাণ্ড

ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ধারাবাহিকতায় গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে নিরঞ্জন ধর পুনরায় শামীমের বাসায় গিয়ে টাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে শামীম ঘরে থাকা ভারী শিল দিয়ে নিরঞ্জনের মাথায় আঘাত করেন।

নিরঞ্জন মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাঁর মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয়, যেন চিৎকার করতে না পারেন। এরপর ধারালো বটি দিয়ে মাথায় একাধিক আঘাত করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

আলামত ও লাশ গুমের চেষ্টা

পিবিআই জানায়, প্রমাণের আলামত মুছে ফেলতে শামীম প্রথমে লাশটি চটের বস্তায় ভরেন এবং পরবর্তীতে একটি চাল রাখার ড্রামে ঢুকিয়ে রাখেন। পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ৮টার দিকে একটি মিশুক (ইজিবাইক) ভাড়া করে ড্রামটি বেগুনবাড়ী স্লুইসগেট এলাকার পানিতে ফেলে দিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।

গ্রেপ্তারকৃত শামীমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে তাঁর ভাড়া বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা শিল ও বটি উদ্ধার করে জব্দ করেছে পুলিশ।

পিবিআইয়ের বক্তব্য

সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই পিবিআই ছায়া তদন্তে নামে। পিবিআইয়ের চৌকস দলের নিরলস প্রচেষ্টা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে দ্রুততম সময়ে প্রধান আসামিকে ধরা সম্ভব হয়েছে। আসামিকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।