
শামীমূল ইসলাম শামীমঃ দুই যুগ আগে ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে পরিবারের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতে নিজের স্ত্রীর প্রতি অভিমান প্রকাশ করেছিলেন শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত সিরিয়াল কিলার এরশাদ শিকদার। ২০০৪ সালের ১০ মে মধ্যরাতে খুলনা জেলা কারাগারে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, তার এত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পরিবারের কেউ তার পাশে থাকেনি বলে তিনি আক্ষেপ করেন।
খুলনার ঘাট এলাকা কেন্দ্রিক অপরাধ সাম্রাজ্যের এই নিয়ন্ত্রক পরিচিত ছিলেন তার নৃশংস অপরাধ কৌশলের জন্য। সহযোগী ও পরবর্তীতে রাজসাক্ষী নূরে আলমের বরাত অনুযায়ী, তিনি অন্তত ৬০টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়, যদিও আদালতে তিনি নিজে ২৪টি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দি দেন। তার শিকারদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, একজন আইনজীবী ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা, যাদের অধিকাংশের লাশ পরে ভৈরব নদে ফেলে দেওয়া হতো এবং কখনো উদ্ধার করা যায়নি।
অপরাধ জগতে উত্থান
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার মাদারঘোনা গ্রামে ১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া এরশাদ শিকদার ষাটের দশকের শেষে খুলনায় চলে আসেন এবং রেলস্টেশনে কুলির সহযোগী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে রেললাইনের পাত চুরির একটি চক্রে জড়িয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে নিজেই ‘রামদা বাহিনী’ নামে একটি সংঘবদ্ধ দল গড়ে তোলেন, যেটি খুলনার রেলস্টেশন ও ঘাট এলাকায় সক্রিয় ছিল। ১৯৮২ সালের মধ্যে তিনি খুলনার ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট এলাকার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
রাজনীতিতে প্রবেশ ও ক্ষমতার বিস্তার
একই বছর জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এরশাদ শিকদার এবং ১৯৮৮ সালে সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হন। পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি একাধিকবার দল পরিবর্তন করেন—বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগ পর্যন্ত—যদিও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত বহিষ্কৃত হন। ১৯৯১ সালে তিনি স্থানীয় একটি বরফকল দখল করেন, যা পরবর্তীতে তার নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে তদন্তে উঠে আসে।
গ্রেফতার ও বিচার
১৯৯৯ সালের নভেম্বরে গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে ৪৩টি মামলা, যার অধিকাংশই হত্যা মামলা, বিচারাধীন ছিল। নিম্ন আদালতের রায়ে সাতটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড এবং চারটি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। রাষ্ট্রপতির কাছে করা প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হওয়ার পর ২০০৪ সালের ১০ মে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এবং খুলনার টুটপাড়া কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এরশাদ শিকদারের বিভিন্ন সূত্রে ছয়টি বিয়ের তথ্য পাওয়া যায় এবং তার প্রথম স্ত্রী খোদেজা বেগমের গর্ভে চারটি সন্তান ছিল। দুই দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসে তিনি এখনো অন্যতম আলোচিত নাম হিসেবে রয়ে গেছেন।

