
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে খাটো ও কলঙ্কিত করার গভীর চক্রান্ত চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ১৯৭১ সালের অর্জনকে কোনোভাবেই আন্ডারএস্টিমেট বা ছোট করার সুযোগ নেই।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল এবং মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দল আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনা সভা শেষে সংগঠন দুটির নেতাকর্মীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অর্জনের মূল ভিত্তি
অনুষ্ঠানে রুহুল কবির রিজভী বলেন, “১৯৭১ সালে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমেই আমরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি। এই অর্জনের ফলেই আজ দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহারের অধিকার পেয়েছে, দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’ হয়েছে এবং মানুষ নিজেদের গর্বিত ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে পরিচয় দিতে পারছে।”
তিনি আরও বলেন, একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্তে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন। তাদের সেই রক্তমাখা শার্ট আজও দেশের মানুষের প্রাণের পতাকার প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তরসূরিরাই আমাদের প্রকৃত ইতিহাস ও স্বাধীনতার গৌরব বহন করে চলেছেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান ও ইতিহাস বিকৃতকারীদের ভূমিকা
বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, তিনি কেবল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই নন, বরং তিনি এক শহীদ পরিবারের সন্তান। তার বড় ভাই লেফটেন্যান্ট শহীদ আশফাকুস সামাদ বীর উত্তম দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করেছেন।
যাঁরা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলাযুদ্ধের গোপন আস্তানা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে চিনিয়ে দিয়েছিলেন, আজ তারাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ছোট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। তাদের কোনো বীরত্বের ইতিহাস নেই, রয়েছে কেবল দালালির ইতিহাস।
একাত্তর ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান একই সূত্রে গাঁথা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, একাত্তরের চেতনা মানুষের বুকের ভেতর গভীরভাবে প্রোথিত ছিল বলেই পরবর্তী সময়ে যখনই মানুষের অধিকার সংকুচিত হয়েছে এবং কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তখন নতুন প্রজন্ম সাহসিকতার সঙ্গে রাজপথে নেমে এসেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ঠিক যেভাবে একাত্তরের পথ ধরে ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক আন্দোলন সফল হয়েছিল, ঠিক একইভাবে একাত্তরের চেতনার পথ ধরেই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকেই আজকের নতুন প্রজন্ম অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
“যারা অত্যন্ত কৌশলে ১৯৭১ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে কোনটি বড় আর কোনটি ছোট—তা নির্ধারণের অপচেষ্টা করছেন, তাদের সে ষড়যন্ত্র কখনোই সফল হবে না। ১৯৭১ হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল গৌরবের ইতিহাস এবং জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানও সেই দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামেরই ধারাবাহিকতার একটি অংশ।”
জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ইঙ্গিত ও রাজনৈতিক স্বার্থ
জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুকৌশলে ইতিহাসকে বিকৃত ও খাটো করার চেষ্টা চলছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদা না দিয়ে অনেকেই নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে নতুন এবং ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালই হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার একমাত্র ভিত্তি। সেই ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই দেশের পরবর্তী প্রজন্ম গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও সার্বিক স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম চালিয়ে গেছে।
বিগত ১৭ বছরের আন্দোলন ও নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান
গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে রিজভী বলেন, দীর্ঘ এই সময়জুড়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা সরকারের চরম দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের মুখেও আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দলটি রাজপথে অদম্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস রক্ষা করতে এবং সব ধরনের ষড়যন্ত্র দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করতে নেতাকর্মীদের সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে। পরিশেষে, নতুন প্রজন্মকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অতুলনীয় অবদান স্মরণ করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

