ময়মনসিংহে অশ্রুসজল চোখে প্রতিমা বিসর্জন: সিঁদুর খেলা ও ঢাকের সুরে দেবী দুর্গার বিদায়

আরিফ রব্বানী, ময়মনসিংহ:

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে। ঢাক-ঢোলের বিদায়ী সুর, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ভক্তদের অশ্রুসজল চোখের মধ্য দিয়ে আনন্দময়ী মা দুর্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে ফিরে গেছেন তাঁর পতিগৃহ কৈলাসে। ময়মনসিংহ নগরীর কাচারী ঘাটসহ জেলার বিভিন্ন নদী ও জলাশয়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়।

বিজয়া দশমীর ঐতিহ্য ও আবেগঘন মুহূর্ত

বিজয়া দশমীর দিন সকাল থেকেই ময়মনসিংহের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে শুরু হয় সমাপনী ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। দেবী দুর্গার চরণতলে ভক্তদের পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ এবং বিদায়ী আরতির মাধ্যমে দিনের সূচনা হয়।

এর পর পরই শুরু হয় আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘সিঁদুর খেলা’। বিবাহিত হিন্দু নারীরা মণ্ডপে দেবীর কপালে সিঁদুর ছোঁয়ানোর পর পরম ভালোবাসায় একে অপরকে সিঁদুর রাঙিয়ে দেন। এই সিঁদুর খেলার মাধ্যমে তাঁরা স্বামীর দীর্ঘায়ু, পরিবারের সমৃদ্ধি এবং বিশ্বশান্তির প্রার্থনা জানান। উৎসবের এই শেষলগ্নে মণ্ডপগুলোতে একদিকে যেমন ছিল আনন্দের আমেজ, অন্যদিকে ছিল মা দুর্গাকে বিদায় জানানোর গভীর আবেগ।

শোভাযাত্রা ও কাচারী ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন

বিকেলের দিকে নগরীর প্রতিটি মণ্ডপ থেকে একে একে বের করা হয় প্রতিমা বিসর্জনের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়ে ভক্তরা প্রতিমা নিয়ে স্থানীয় জলাশয় ও নদী ঘাটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

পরবর্তীতে ময়মনসিংহ নগরীর ব্রহ্মপুত্র নদের কাচারী ঘাটে সুশৃঙ্খলভাবে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। বিসর্জন প্রক্রিয়া শেষ হতেই ভক্তরা একে অপরের সাথে বিজয়ার শুভেচ্ছা ও কোলাকুলি বিনিময় করেন।

কড়া নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ উৎসব উদযাপন

এবারের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় ছিল। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ জানান, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কারণে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর পরিবেশে উৎসব সম্পন্ন হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যেসকল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল:

  • পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি: কোতুয়ালী মডেল থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি।

  • প্রযুক্তি ও টহল: পূজামণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পুলিশের বিশেষ মোবাইল টহল দল।

  • স্বেচ্ছাসেবক: বিভিন্ন স্থানীয় ও সহযোগী সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকদের নিরলস দায়িত্ব পালন।

ময়মনসিংহ জেলায় মোট ৮১৪টি মণ্ডপে পূজা উদযাপন

জেলা পুলিশের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ময়মনসিংহ জেলার ১৪টি থানা এলাকায় এ বছর মোট ৮১৪টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হয়েছে।

উপজেলা ও থানাওয়ারী পূজামণ্ডপের পরিসংখ্যান:

এলাকা/থানার নামমণ্ডপের সংখ্যা
কোতোয়ালী মডেল থানা (সিটি করপোরেশনসহ)১৩২টি
মুক্তাগাছা১১৪টি
ফুলবাড়িয়া৭৩টি
ত্রিশাল৬৯টি
ভালুকা৬৭টি
গৌরীপুর৬৪টি
হালুয়াঘাট৬১টি
ঈশ্বরগঞ্জ৫০টি
তারাকান্দা৫০টি
ফুলপুর৪৮টি
ধোবাউড়া৩৫টি
নান্দাইল৩০টি
পাগলা১১টি
গফরগাঁও১০টি
সর্বমোট৮১৪টি

গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি

প্রতিমা বিসর্জন ও বিজয়া দশমীর শোভাযাত্রায় উপস্থিত থেকে উৎসবের শৃঙ্খলা তদারকি করেন ময়মনসিংহের প্রশাসনের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক নেতাবৃন্দ।

উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন, ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান, পুলিশ সুপার কামরুল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আশরাফুল করিম এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোঃ আসাদুজ্জামান শাকিল।

এছাড়াও কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিবিরুল ইসলাম, জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি মাহবুবুল হকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।