
নেত্রকোনা প্রতিনিধি | প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬
নেত্রকোনায় রূপসী বাংলা আইপি টিভির জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নেতারা। রুর্যাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশনের (আরজেএফ) চেয়ারম্যান এস এম জহিরুল ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “মানুষ হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করুন, বিচারের নামে কোনো ধরনের প্রহসন সহ্য করা হবে না।”
গত ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সামনে আরজেএফ নেত্রকোনা জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এক প্রতিবাদী মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন সাংবাদিকেরা
মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আরজেএফ চেয়ারম্যান এস এম জহিরুল ইসলাম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, সাংবাদিকদের জায়গা রাজপথ কিংবা আন্দোলন নয়; তাদের কাজ কাগজ-কলম নিয়ে দেশের উন্নয়ন ও মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরা। কিন্তু সহকর্মী আলিফ ফকিরকে নৃসংশভাবে গুলি করে হত্যা করার পরও সুষ্ঠু বিচার না পাওয়ায় আজ তাদের রাজপথে নামতে হয়েছে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের দেশে আইন ও সংবিধান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তার সঠিক প্রতিফলন দেখা যায় না। সরকার পরিবর্তন হলেও সাংবাদিক হত্যার কোনো বিচার হয় না। অতীতেও সাগর-রুনিসহ বহু সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার মেলেনি। এ ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে আলিফ হত্যার পেছনের সব অপরাধীকে অবিলম্বে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।”
সংবাদ প্রকাশের জেরে কি এই হত্যাকাণ্ড?
নিহত লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে তিনি সীমান্ত এলাকার নানা অনিয়ম, সীমান্ত অপরাধ ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অনুসন্ধানী তথ্য প্রকাশ করতেন।
সাংবাদিক নেতাদের দাবি, বস্তুনিষ্ঠ ও অপরাধবিরোধী সংবাদ প্রকাশের কারণেই হয়তো ক্ষুব্ধ হয়ে দুর্বৃত্তরা তাকে টার্গেট করেছে। সাংবাদিকদের এভাবে ‘পাখির মতো’ গুলি করে হত্যা এবং কাজের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে মন্তব্য করেন তারা।
মামলা ও তদন্তের বর্তমান পরিস্থিতি
গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন আলিফ। এই ঘটনার পর দিন তার স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাত পরিচয় ৮-১০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে এ পর্যন্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে:
- প্রথম গ্রেফতার: গত ১৮ অক্টোবর সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব নামের এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। আদালত প্রথম দফায় ১ দিন এবং পরবর্তীতে আরও ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
- দ্বিতীয় গ্রেফতার: র্যাব-১৪-এর একটি বিশেষ দল দুর্গাপুরের শহীদ মিনার এলাকা থেকে আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণ নামের অপর এক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে। গত বুধবার নেত্রকোনার জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাকে ৩ দিনের পুলিশ রিমান্ডে পাঠিয়েছেন।
কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি
ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন আরজেএফ নেত্রকোনা জেলা শাখার সভাপতি সুজাদুল ইসলাম ফারাস এবং পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক এরশাদুল হক জনি। মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, প্রবীণ সাংবাদিক শ্যামলেন্দু পাল, জাহিদ হাসান এবং সম্পাদক এম মুখলেছুর রহমান খানসহ স্থানীয় সাংবাদিক নেতারা।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রদান রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আলিফ হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে কোনো প্রকার গড়িমসি করা হলে সারাদেশের সাংবাদিকসমাজ পরবর্তীতে আরও কঠোর আন্দোলন কর্মসূচির ডাক দিতে বাধ্য হবে।
মানববন্ধনে কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ের আরজেএফ নেতাবৃন্দসহ স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

