
ত্রিশাল প্রতিদিন ডেস্ক:
টানা বর্ষণের ফলে ময়মনসিংহ নগরীতে আবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করায় স্থবির হয়ে পড়েছে নগরজীবন। ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশায় সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি এখন চরমে।
চলতি বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিট থেকে বুধবার (৮ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র ৯ ঘণ্টায় ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটি চলতি বছরে ময়মনসিংহের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন জানান, মূলত নিম্নচাপের প্রভাবেই এই ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। নিম্নচাপের প্রভাব কেটে গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তলিয়ে গেছে সড়ক ও আবাসিক এলাকা
বুধবার সকাল থেকে সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। যেসব এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
চরপাড়া ও নতুন বাজার
ক্যাডেট কলেজ ও মহিলা কলেজ সংলগ্ন এলাকা
কেওয়াটখালী ও সানকিপাড়া
গোলকিবাড়ি ও পুরোহিতপাড়া
ধোপাখলার বাঁশবাড়ি কলোনি
এসব এলাকার সড়কগুলো কার্যত পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্যাডেট কলেজের সামনের সড়কে ড্রেনের পানি উপচে রাস্তায় চলে আসায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। রিকশা, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চালকদের ঝুঁকি নিয়ে ধীরগতিতে চলতে দেখা গেছে। বাঁশবাড়ি কলোনির অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় বাসিন্দাদের রান্না-বান্না বন্ধ হয়ে গেছে এবং তারা নিজ উদ্যোগে পানি সেচে বের করার চেষ্টা করছেন।
চরম ভোগান্তিতে রোগী ও শিক্ষার্থীরা
জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। হাসপাতাল চত্বরে হাঁটুপানি জমে থাকায় এক ভবন থেকে অন্য ভবনে যাতায়াত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
চরপাড়া এলাকার এক বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম ত্রিশাল প্রতিদিন-কে বলেন, “বৃষ্টি হলেই আমাদের এলাকায় পানি জমে যায়। সকালে উঠে দেখি পুরো উঠান তলিয়ে গেছে। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।” মহিলা কলেজ এলাকার নাজমা আক্তার জানান, কলেজের গেটে পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থীদের জুতা হাতে নিয়ে হাঁটুপানি ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতে হচ্ছে।
জলাবদ্ধতার মূল কারণ কী?
নগরবাসীর মতে, সামান্য বৃষ্টিতেই নগরী তলিয়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে:
অপর্যাপ্ত ও অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা।
নিয়মিত ড্রেন ও খাল পরিষ্কার না করা।
অবৈধভাবে ড্রেন দখল করে সংকুচিত করে ফেলা।
ক্যাডেট কলেজ সড়কের অটোরিকশাচালক রুবেল মিয়া জানান, রাস্তায় পানি জমে থাকায় গর্ত বোঝা যায় না, ফলে দুর্ঘটনার বড় ঝুঁকি থাকে।
মাঠে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন
জনদুর্ভোগ কমাতে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ শুরু করেছে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন (মসিক)। বুধবার সকাল থেকেই মসিক প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন নগরীর বিভিন্ন এলাকা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন।
তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তার ১১০তম দিন। অতিবৃষ্টির কারণে এই আকস্মিক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের বাধাগুলো দূর করতে তাৎক্ষণিকভাবে শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছে। আগামী বর্ষা মৌসুমে যেন নগরবাসীকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়, সে বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস
ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তবে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদিকে, এইচএসসি পরীক্ষা নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, নিম্নচাপের কারণে আগামী কয়েকদিন এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নগরবাসীকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

