অপমানের মধুর প্রতিশোধ নিলো মাদ্রাসা ছাত্ররা

ত্রিশাল প্রতিদিন ডেস্ক:: ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল, তারপর আখতার হোসেন নামক এক ছাত্র একা রাজু ভাস্কর্যের পাশে অনশনে বসে গেলেন এক দাবি নিয়ে। তার দাবি ছিল খুব সহজ ও পরিষ্কার। আখতার হোসেন দাবি করেছিল, পরীক্ষা বাতিল করে আবার নেয়া হোক ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষা। এই দাবিতে অনশনের এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন ঢাবি ছাত্র আখতার।

কিন্তু তার কথায় কর্ণপাত করার প্রয়োজন মনে করেননি ঢাবি প্রশাসনের কেউই। এমনকি আখতারের অসুস্থতাও তাদের বিবেককে এতটুকুও নাড়া দেয়নি। বরঞ্চ তাকে সইতে হয়েছে শিক্ষক ও প্রশাসনের লাঞ্চনা ও ‘মাদ্রাসা ছাত্র’ হওয়ায় তাচ্ছিল্য। তবে গতকাল (মঙ্গলবার) এর জবাব ঠিকই পেয়েছে ঢাবি প্রশাসন।

জল অনেক ঘোলা হওয়ার পর শেষ অবধি ঢাবি প্রশাসন ঠিকই আখতারের দাবি মেনেছে। কিন্তু তার আগে ঢাবি প্রশাসন তাদের সাম্প্রদায়িকতা এবং বৈষম্যের চিত্রটাই তুলে ধরেছে। শুধু প্রশাসনই নয়, কিছু শিক্ষকও তাদের নেতিবাচক মানসিকতার দৃষ্টান্তও দেখিয়েছেন। কিন্তু তাতে মাদ্রাসা ছাত্রদের এতটুকুও ক্ষতি হয়নি। বরং কালি পড়েছে প্রশাসন এবং ওই সব শিক্ষকদের মুখে। কেননা অনেক চাপের মুখে ঢাবি প্রশাসন যখন ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষা পুনরায় নিলো তখন সেখানে জয়জয়কার মাদ্রাসা ছাত্রদের। যে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে গতকাল। ওই ফলাফলে শীর্ষ পাঁচ জনের সবাই মাদ্রাসা ছাত্র। এর চেয়ে মধুর জবাব আর কি হতে পারে?

এবার আসা যাক আখতারের ঘটনায়, ঢাবির সাধারণ ছাত্র আখতার অনশনে বসলো, তাতে সায় দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বরং এই প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর যে কথা বলেছেন, সেটা একজন শিক্ষকের মুখে আসাটাই অবান্তর। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে আখতারের একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ‘ওর ব্যাকগ্রাউন্ড খারাপ, মাদ্রাসায় পড়েছে। ওর অনশনে সমস্যা আছে। প্রক্টরে দায়িত্বে থাকাকালীন একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এ ধরণের সাম্প্রদায়িক কথা শোনাটা ওই প্রতিষ্ঠানের জন্যই দুর্ভাগ্যজনক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-যাকে নাকি বলা হয় মুক্তমতের সূতিকাগার, এরকম একটি অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে তিনি এমন সাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা লালন করে কিভাবে প্রক্টর পদের বড় দায়িত্ব পালন করছেন সেটাই ভাবনার বিষয়।

তার এ মন্তব্যে মাদ্রাসার ছাত্রদেরই শুধু অপমান করেননি, প্রশ্নফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধকেও তিনি প্রশ্রয় দিয়েছেন। অনশন যেই করুক, তার ব্যাকগ্রাউন্ড কি সেটা খুঁজে বের করতে প্রক্টর স্যারের সমস্যা হয় না, সমস্যা হয় কারা প্রশ্ন ফাঁস করে সেটা খুঁজে বের করতে। প্রশ্নফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে যেতে তার যতো সমস্যা।

আখতার ইস্যুতে পরিবেশ ভারী হওয়ায় তার পাশে দাঁড়ায় সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাম ছাত্রসংগঠনসহ টিএসসি কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক দলগুলো। তারা সবাই পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে একাত্ম হয়। ফলে, চাপের মুখে পড়ে প্রশাসন আবারো পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা দেয়। সেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে এই সপ্তাহে, ফলাফলও প্রকাশিত হয়েছে।

ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, পুনরায় নেয়া পরীক্ষায় দেখা যায়, মেধাতালিকার প্রথম পাঁচজনই মাদ্রাসা শিক্ষার্থী! যে পরীক্ষা পুনরায় নেয়ার আন্দোলন শুরু করেছিল একজন আখতার হোসেন, আন্দোলন করে যে তাচ্ছিল্যের শিকার হয়েছিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বলে, সে পরীক্ষা আবার নিতেই হয়েছে ঢাবিকে। আর সেই পরীক্ষাতেই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অবিশ্বাস্য ফলাফল। এ যেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বলে অবজ্ঞা অবহেলা তাচ্ছিল্য করার বিরুদ্ধে একটা জবাব। – আমাদের সময়.কম।