ভারতের দ্বিমুখী কৌশল ও বাংলাদেশের উত্তরণ: একটি ভৌগোলিক বাস্তবতা

ভারতের দ্বিমুখী কৌশল ও বাংলাদেশের উত্তরণ:

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত সবসময় ইতিহাস, কৌশলগত দায়বদ্ধতা এবং নৈতিক অবস্থানের কথা উল্লেখ করতে পছন্দ করে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আচরণ এক ধরনের গভীর হতাশা প্রকাশ করে—যা কৌশলগত জ্ঞানের  সমারোহে ঢাকা একটি অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার এবং নিজেদের রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। এই বৈপরীত্য দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং ঢাকা এখন আর তা উপেক্ষা করার ভান করতে আগ্রহী নয়।

ভারতের ঘোষিত আদর্শ ও বাস্তব আচরণের মধ্যকার এই ব্যবধানই বর্তমান পরিস্থিতিকে তীব্র করে তুলেছে।যা ভারত সীমান্তজুড়ে গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং আঞ্চলিক শান্তির জন্য বাংলাদেশে স্থিতিশীলতার কথা বলে। কিন্তু অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বৈরাচার ও দমনমূলক নীতির সাথে জড়িত থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিয়মিত মুখরোচক হয়ে উঠছেন। যেসব শক্তিকে একসময় দমন-পীড়নের নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের হঠাৎ করেই (বিবেকী নির্বাসিত) হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে বিশ্বের কাছে। যখন এই ব্যক্তিরা ভারতীয় মঞ্চ ব্যবহার করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তা কেবল মতামত নয়, বরং অস্থিতিশীলতার সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে পড়ে।

ভারতের এই অবস্থানকে ‘চাণক্য নীতি’র বাস্তববাদী প্রয়োগ নয় বরং এর বিরোদ্ধে অবস্থান বলে মনে করা হচ্ছে। যেখানে ক্ষমতার দর্শন নীতিহীন ও বাস্তববাদী। কিন্তু আসল চাণক্য দর্শন ছিল স্থূল সুবিধাবাদ নয়; বরং তা ছিল পরিমিত বাস্তববাদ—প্রেক্ষাপট বোঝা, শক্তিকে সম্মান করা এবং অপ্রয়োজনীয় উস্কানি এড়ানো চলা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত মনে হয় কৌশলের শৃঙ্খলা নয়, বরং কেবল আড়ম্বর গ্রহণ করেছে। চাপ প্রয়োগ এবং মনস্তাত্ত্বিক সংকেতের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, যেন ঢাকা কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের একটি মাত্র প্রান্তিক অঞ্চল মাত্র।

এই দ্ব্যর্থক বার্তা সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়েও দেখা দিচ্ছে। শিলিগুড়ি করিডোরে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি বা সীমান্তে কড়াকড়িকে প্রতিরক্ষামূলক প্রয়োজনীয়তা বলা হলেও, বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা ভারতীয় মিডিয়ার বয়ানের সাথে এটি যুক্ত হলে তা ভিন্ন অর্থ বহন করে যা সবার জানা। এসব পদক্ষেপ তখন প্রতিরোধের চেয়ে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেই বেশি পরিলক্ষিত হয়।

ভারতে অনেক সমস্যা রয়েছে যা দেশের ভেতরে বেকারত্ব, বৈষম্য বা গণতান্ত্রিক সংকট—এসব কঠিন ইস্যু এড়িয়ে জনমনের দৃষ্টি বাইরের দিকে সরানো হয়। বাংলাদেশকে শুধু নয় সাথে নেপালকেও নির্বাচনী বয়ান বা সংসদীয় আলোচনার বিষয় বানানো হয়। নাটকীয়করণ এবং নিরাপত্তামূলক সংকট তৈরির এই ধারা ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান বা চীনের ক্ষেত্রে যা করে আসছে, তারই প্রতিধ্বনি। পার্থক্য শুধু এই যে, বাংলাদেশ এখন আর আগের মতো নেই।

আজকের বাংলাদেশ ভারতের আগ্রাসনকে পছন্দ করছে না। দেশটি এখন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং বহুমুখী অংশীদারিত্ব চায়। ভারতের ধারণা যে তারা রাজনৈতিকভাবে খেলার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তা এখন পুরনো যুগের চিন্তা। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতির সাথে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ‘ভাগ ও শাসন’ নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটালে তা কেবল ভুল হিসাবই নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাসকেও ক্ষুণ্ণ করবে।

চাণক্য নিজেও নৈকট্যকে নিয়ন্ত্রণের সাথে গুলিয়ে ফেলার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। প্রতিবেশীরা নিজেদের মর্যাদা ও স্বকীয়তা নিয়ে রাজনীতি করে। যে রাষ্ট্র জোরপূর্বক নিজের উপস্থিতি চাপিয়ে দেয়, সে হয়তো স্বল্পমেয়াদে লাভবান হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সদিচ্ছা হারায়। ভারতকে অভিভাবকত্ব আর বন্ধুত্বের মধ্যে পার্থক্যটি বুঝতে হবে।

সমাধানের পথ বাস্তবসম্মত। শুধু নিজের সুবিধা নয় ভারতের উচিত কথার সাথে কাজের সামঞ্জস্য আনা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা এবং অস্থিতিশীল কণ্ঠস্বরকে প্রশ্রয় দেওয়ার দ্বৈত নীতি পরিহার করা। জবরদস্তির চেয়ে সম্মানজনক কূটনীতি অনেক বেশি কার্যকর। কৌশলগত ধৈর্যের অর্থ শুধু সংকেত দেওয়া নয়, আর নৈতিক অবস্থান কেবল দাবিতেই হয় না, তা বাস্তবে মানতে হয়।

বাংলাদেশ ভারতের কাছে কোনো বিশেষ ছাড় চায় না চায় সমঅধিকারের স্বীকৃতি। চাপের ওপর ভিত্তি করে কোনো টেকসই প্রতিবেশী গড়ে ওঠে না। আগামী দিনগুলোই দেখাবে, ভারত পুরনো অভিভাবকত্বের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সম্মানজনক সম্পর্ক গড়তে পারে কি না। এই টানাপোড়েনের সমাধান ভারতকেই দিতে হবে। ভারত কীভাবে এই দ্বন্দ্ব মোকাবেলা করবে, তার ওপরই দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে।