প্রতিশোধমূলক রাজনীতি ভুলে আমাদের দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে হবে-প্রধানমন্ত্রী

প্রতিশোনামূলক রাজনীতি ভুলে আমাদের দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে হবে-প্রধানমন্ত্রী

ত্রিশাল প্রতিদিন ডেস্ক: ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘ সময় অন্যায়-নির্যাতনের শিকার হলেও, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি ভুলে দেশের অগ্রযাত্রায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, “আমাদের প্রতিহিংসার মানসিকতা বদলাতে হবে। আসুন নিজের চিন্তা কিছুটা পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। হ্যাঁ, আমার সঙ্গে যা হয়েছে, এখন প্রতিশোধ নিলে সেটা ফেরত পাবো না। তাই প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আমরা দেশের জন্য কী করতে পারি, সেই চেষ্টা করতে পারি। সফল হওয়া পরের ব্যাপার, অন্তত দেশের জন্য কাজ করার মানসিকতা নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাবো।”

মঙ্গলবার (১৬ জুন) বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রতি বছর ১৬ জুন বাংলাদেশে ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে তৎকালীন বাকশাল সরকার ৪টি রাষ্ট্রীয় পত্রিকা বাদে দেশের সব সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল করে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করেছিল।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গঠনমূলক সমালোচনা

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “বিএনপি সরকার বারবার প্রমাণ করেছে যে গণমাধ্যমের সঙ্গে তাদের শত্রুতা নেই। আর তাই বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। সরকারের ভুল হতে পারে, ফলে গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনা হোক।”

বাকশালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, “১৯৭৫ সালের এই দিনে সংবাদপত্রের যে গলা চেপে ধরা হয়েছিল, সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। বাকশাল গঠনের মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করলেন এবং সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেন।”

দেশ গঠনে সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনাদের সহযোগিতা না পেলে আমি বুঝতে পারবো না কাজটা ভালো হচ্ছে না খারাপ হচ্ছে। আপনারা সহযোগিতা করলে আমার কাজ সহজ হবে। ভালো কাজের পথটাও আপনাদের দেখিয়ে দিতে হবে।”

তরুণ প্রজন্ম ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে বিশেষ তাগিদ

দেশের যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং তাদের বিপুল শক্তিকে ইতিবাচক খাতে ব্যবহার করতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

  • নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতা: মাঠের তীব্র সংকট থাকার পরও তরুণদের যুক্ত করতে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা’ পুনরায় চালু করা হয়েছে। সম্প্রতি সমাপ্ত একটি শিক্ষা বিভাগীয় ইভেন্টে সারা দেশের প্রায় ২২ লাখ ছেলেমেয়ে অংশ নিয়েছে।
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ: যুব সমাজকে সুস্থ ধারায় ফেরাতে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সারা বছরব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনী মেলা (সায়েন্স ফেয়ার) আয়োজনের তাগিদ দেন তিনি।
  • সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়: সমসাময়িক বিভিন্ন সহিংসতার ভিডিও ধারণ ও সামাজিক অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একটি জীবন্ত প্রাণীকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে আর ১০ জন মিলে তা মোবাইলে রেকর্ড করছে—এগুলো অস্বাভাবিক মানসিকতা। স্কুল পর্যায় থেকেই সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

দায়িত্বের তীব্র চাপ এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার স্মৃতিচারণ

নির্বাচনের পর মানুষের চোখে-মুখে স্বস্তি ও খুশি দেখলেও দেশের প্রচুর সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার কারণে দায়িত্বের তীব্র চাপ অনুভব করছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন:

“কয়েকদিন আগে আমি অফিস থেকে যখন বাসায় যাচ্ছি, তখন আমার সঙ্গে গাড়িতে যারা ছিল, আমি তাদের বলছিলাম—আব্বা একসময় উনার একজন সহকর্মীকে বলেছিলেন যে দিনটা যদি ৪৮ ঘণ্টা হতো তাহলে আমরা আরেকটু বেটার কাজ করতে পারতাম। আব্বার মতো আমারও এখন মনে হয় আসলে দিন ২৪ ঘণ্টা না হয়ে যদি ৪৮ ঘণ্টা হতো তাহলে একটু ভালো হতো। কখন অফিসে ঢুকছি আর কখন সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, একটু বুঝতেই পারছি না।”

‘ক্ষতি যা হওয়ার হয়েছে, লক্ষ্য এখন দেশের কল্যাণ’

নিজের ওপর অতীতে হওয়া অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিবরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আমি জেলের মধ্যে থেকে এসেছি, শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়েছি। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হওয়ায় এখনো এক্স-রে করলে হয়তো দেখা যাবে পিঠের হাড্ডিটা বাঁকাভাবে একটু লেগে আছে। মাঝে মাঝে এখনো আমি সেই ব্যথা অনুভব করি। কিন্তু আমি এখন যদি যারা এর জন্য দায়ী তাদের খুঁজে বেড়াই বা প্রতিশোধ নিতে যাই, তবে আমার হাড্ডি তো জোড়া লাগবে না, ব্যথাও কমবে না। সুতরাং ক্ষতি যা হয়ে গেছে সেটা নিয়ে না ভেবে দেশের কল্যাণের কথা ভাবতে হবে।” নিজের নেতাকর্মীদের কাছেও প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করে দেশের জন্য কাজ করার এই বার্তাটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি সাংবাদিকদের অনুরোধ জানান।