অস্ত্রোপচার ছাড়াই দৃষ্টি ফেরাতে নতুন আশা, বিপ্লব এনেছে ‘লিকুইড কর্নিয়া’

অস্ত্রোপচার ছাড়াই দৃষ্টি ফেরাতে নতুন আশা, বিপ্লব এনেছে ‘লিকুইড কর্নিয়া’

বিশেষ প্রতিবেদক, ত্রিশাল প্রতিদিনঃ বয়সের ভারে চশমা এঁটেও বইয়ের ছোট ছোট অক্ষর পড়তে যেমন বারবার চোখ রগড়াতে হয়, তেমনি যাঁদের দৃষ্টিই চলে গেছে, তাঁদের কাছে গোটা জগৎ এক নিশুতি অন্ধকার। এতদিন দৃষ্টিহীনদের আলোর দেশে ফেরানোর প্রধান উপায় ছিল চক্ষু বা কর্নিয়া প্রতিস্থাপন। কিন্তু এই অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি যেমন বিস্তর, তেমনি সফল হওয়ার নিশ্চয়তাও নেই বললেই চলে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অভাবনীয় উৎকর্ষে সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে তুলেছে নতুন এক প্রযুক্তি—‘লিকুইড কর্নিয়া’। বিষয়টি যথেষ্ট নতুন হলেও, এর কার্যকারিতা নিয়ে দেশের বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট আশাবাদী।

কী এই কর্নিয়া প্রতিস্থাপন? আমাদের চোখের সামনের স্বচ্ছ অংশটিকেই বলা হয় কর্নিয়া। এর মধ্য দিয়েই আলোকরশ্মি চোখের ভেতরে প্রবেশ করে রেটিনায় কেন্দ্রীভূত হয়। কর্নিয়ার কারণেই আমরা সামনের দৃশ্য স্পষ্ট দেখতে পাই। কোনও কারণে কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্বচ্ছ হয়ে গেলে দৃষ্টি ঝাপসা হতে হতে চলেও যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনই ছিল একমাত্র পথ। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি মোটেই সহজ নয়। সদ্যোমৃত দাতার চোখ থেকে কর্নিয়া তুলে গ্রহীতার চোখে বসানোর কাজটি অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। পেঁয়াজের খোসার মতো কর্নিয়ারও অনেকগুলো স্তর থাকে। মৃতদেহ থেকে কর্নিয়া তোলার সময় এর যদি একটি স্তরও আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তবে প্রতিস্থাপন ব্যর্থ হতে বাধ্য। এই জটিলতা ও ঝুঁকি কমাতেই বেঙ্গালুরুর একটি গবেষণা সংস্থা লিকুইড কর্নিয়ার উদ্ভাবন করেছে।

কী এই লিকুইড কর্নিয়া? গবেষণাগারে তৈরি একধরনের বায়ো-পলিমারই হলো এই লিকুইড কর্নিয়া। হাইড্রোজেল দিয়ে তৈরি এই বিশেষ উপাদানে রয়েছে কোলাজেন, ফাইব্রিনোজেন এবং নতুন কোষ তৈরির ক্ষমতাসম্পন্ন স্টেম কোষ। এই তরল উপাদানটি ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে রোগীর চোখে প্রবেশ করানো হবে। এরপর এটি কর্নিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে গিয়ে নতুন করে কোষ তৈরির কাজ শুরু করবে এবং ধীরে ধীরে আসল কর্নিয়ার মতোই গঠন তৈরি করবে। অর্থাৎ, অপারেশন করে কর্নিয়া বদলানোর বদলে চোখের ভেতরেই নতুন করে কর্নিয়া তৈরি করা সম্ভব হবে। গবেষকদের দাবি, এই হাইড্রোজেল অবিকল আসল কর্নিয়ার মতোই কাজ করবে। এর মধ্য দিয়ে আলোকরশ্মি ঠিকভাবেই চোখে প্রবেশ করবে এবং প্রতিফলন ঘটিয়ে দৃষ্টিহীন মানুষের চোখে আলো ফিরিয়ে দেবে।

কাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে? যাঁদের কর্নিয়া অস্বচ্ছ হয়ে গেছে, কর্নিয়ার কোনও স্তর আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বা কর্নিয়াল আলসারের কারণে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়েছে বা চলে গেছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই লিকুইড কর্নিয়া প্রয়োগ করা যেতে পারে। অনেক সময় চোখে সংক্রমণের কারণেও দৃষ্টি নষ্ট হয়; সংক্রমণ সারলেও কর্নিয়ায় দাগ থেকে যায়, যা থেকে অস্বচ্ছতা তৈরি হয়। যেহেতু কর্নিয়ার ঠিক মাঝখানের অংশ দিয়ে আমরা দেখি, সেই স্থানটি অস্বচ্ছ হলেই মূলত অন্ধত্ব নেমে আসে। জন্মগতভাবেও অনেকের কর্নিয়া অস্বচ্ছ থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রেও এই নতুন প্রযুক্তি দারুণ ফল দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে কোন রোগীর ক্ষেত্রে এই লিকুইড কর্নিয়া প্রয়োগ করা যাবে আর কোন ক্ষেত্রে যাবে না, তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবেন চিকিৎসকই।

(সৌজন্য: আনন্দবাজার পত্রিকা)