সাতদিনের মাস্টার প্লানে সন্দেহর বাইরে নন স্ত্রীও


বরগুনায় রাস্তায় ফেলে প্রকাশ্য দিবালোকে স্ত্রীর সামনে রিফাত শরীফ (২৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড ও তার সঙ্গীরা।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) সকাল ৯টার দিকে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে বরগুনা সদর থানায় মামলা দায়ের করেন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ।

ওই মামলায় আখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে মূল ঘাতক নয়ন ছাড়াও মামলার দুই নম্বর আসামি রিফাত ফরাজী, তিন নম্বর রিসান ফরাজীসহ বেশ কয়েকজন এখনও পলাতক।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র বলছে- তদন্ত চলাকালীন ও গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, রিফাতকে খুন করার পরিকল্পনা সাতদিন ধরে কষা হয়।

আর আগে মঙ্গলবার (২৫ জুন) রাতে চূড়ান্ত বৈঠক হয়। এর ধারাবাহিকতায় বুধবার (২৬ জুন) সকাল থেকেই রিফাতের গতিবিধি উপর নজর রাখে ঘাতক নয়ন ও তার সঙ্গীরা। রিফাত তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকার সঙ্গে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে দেখা করবে এমন ধারণাতে আগে থেকেই কলেজের সামনে অবস্থান করছিলেন তারা।

সূত্র আরও জানায়, প্রথমে অন্যরা রিফাতের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করলেও নয়ন ও রিফাত ফরাজী সামনে আসেনি। তর্কের এক পর্যায়ে তারা দু’জন রিফাতকে কোপাতে শিরি করেন। রিফাতকে নিস্তেজ করেই তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

বরগুনায় প্রকাশ্যে স্ত্রীর সামনে খুন হওয়া রিফাতকে নিয়ে এবার মুখ খুললেন স্থানীয় এমপি শম্ভু দেবনাথের ছেলে সুনাম দেবনাথ। তিনি নিহত রিফাতের কাছের বড় ভাই ছিলেন বলে জানান ফেসবুকে। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একাধিক স্ট্যাটাস, পোস্ট ও ছবি প্রকাশ করেছেন

একটি পোস্টে তিনি রিফাত হত্যায় স্ত্রী মিন্নিকে ‘মূল ভিলেন’ হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বিভিন্ন খবর ও মিডিয়াতে যাকে এখন হিরো বানানো হচ্ছে মূল ভিলেন সে নিজেও হতে পারে, রিফাত শরিফের বন্ধুদের থেকে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে তাতে এটাই বুঝা যায়।’

অপর একটি স্ট্যাটাসে স্থানীয় আইনজীবীদের রিফাত হত্যায় জড়িতদের পক্ষে না দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। এছাড়া, রিফাতে স্কেচ ও ছবি পোস্ট করে সুনাম নিহত রিফাতকে স্মরণ করেছেন।

বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তার ওপর স্ত্রীর সামনে স্বামীকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নির সঙ্গে প্রধান আসামী সাব্বির হোসেন নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডের বিয়ে হয়েছিল। তাদের বিয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কাজী মো. আনিসুর রহমান ভূঁইয়া। তিনি বরগুনা পৌরসভার ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্টার। বরগুনা পৌরসভার ডিকেপি রোডের কেজি স্কুল নামক স্ট্যান্ডে তার অফিস।

নয়ন বন্ড ও আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির বিয়ের প্রথম স্বাক্ষী রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় আসামি বাকিবুল হাসান রিফাত ওরফে রিফাত ফরাজি। গত বছরের ১৫ অক্টোবর আছরের নামাজের পর তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের দেনমোহর হয়েছিল ৫ লাখ টাকা। তবে দেনমোহরের কোনো নগদ পরিশোধ ছিল না।



কাজী মো. আনিসুর রহমান বলেন, বিয়ে করার জন্য নয়ন ও মিন্নিসহ ১৫ থেকে ২০ জন লোক আসে আমার অফিসে। এসময় নয়ন ও মিন্নি তাদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার প্রমাণস্বরূপ এসএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট নিয়ে আসে। এরপর আমি মেয়ের বাবার সঙ্গে কথা বলে জানতে চাইলে তারা বলে, মেয়ের বাবা আসবে না, আপনি মেয়ের মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর মিন্নির মা পরিচয়ে একজন আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

তিনি আমাকে বলেন, বিয়ের বিষয়টি আমরাতো জানি। মিন্নির বাবা বিয়েটা এখন মানবে না। আপনি বিয়ে সম্পন্ন করেন। বিয়ের কিছুদিন পর ঠিকই মেনে নেবেন। এরপর আমি পাঁচ লাখ টাকা দেনমোহরে নয়ন ও মিন্নির বিয়ে সম্পন্ন করি। এ বিয়ের উকিল ছিলেন শাওন নামের একজন। শাওন ডিকেপি রোডের মো. জালাল আহমেদের ছেলে।



কিন্তু এর আগে মিন্নি বলেন, আমার বিয়ে হয়েছে একমাত্র রিফাত শরীফের সঙ্গে। এছাড়া আর কখনো কারও সঙ্গে বিয়ে হয়নি। যেহেতু বিয়েই হয়নি, ডিভোর্স হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। রিফাতই আমার স্বামী এবং এটাই সত্য। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই দাবি করি, যারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে আমি তাদের ফাঁসি চাই।

ঘটনার বর্তমান অবস্থা সর্ম্পকে জানতে চাইলে বরগুনা পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযান অব্যাহত আছে। এখন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত দু’জন, ও তার বাইরে দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে, কিছু তথ্য পেয়েছি। অন্যদেরও গ্রেফতারের আওতায় আনতে অভিযান চলছে।