শ্রুতিমধুর ময়মনসিংহ অঞ্চল ভাল লাগার অন্য নাম

লোক শূণ্যতায় সবুজে ছেয়েছে ময়মনসিংহের জয়নুল উদ্যান
বাংলাদেশের নদীদূষণ ও ভাষাদূষণ দুটোই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে এবং ক্রমাগত বাড়ছে। তবে এফএম রেডিওগুলোতে বাংলা-ইংরেজির অদ্ভুত মিশেল ও বিকৃত উচ্চারণ এবং ডিজুস প্রজন্মের কথোপকথন এখন আর আগের মতো পীড়া দেয় না। বরং এগুলো এখন গা-সওয়া বা কান-সওয়া যেটাই বলা হোক না কেন তা এক প্রকার সহ্যই হয়ে গিয়েছে।  দৈনন্দিন কথোপকথনে সম্বোধন হিসেবে ব্রো (ভাই), সিস (বোন), মেট (বন্ধু) ইত্যাদি এখন বেশি প্রচলিত। তবে এসবের মধ্যেও আঞ্চলিক ভিত্তিক ভাষার ব্যবহার এখনও জনপ্রিয়।
মোটামুটি সকল জেলার ভাষাই সহজবোধ্য শুধুমাত্র সিলেট এবং চট্টগ্রাম বাদে। বলা হয়ে থাকে বাংলা ভাষা সিলেট এসে আহত হয়েছে এবং চট্টগ্রাম এসে নিহত হয়েছে! তবে সহজবোধ্যের মধ্যে ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, যশোর, রাজশাহী উল্লেখযোগ্য।

যদি সবচেয়ে শুদ্ধ ভাষা বলা হয় তবে কুষ্টিয়ার ভাষা মোটামুটি শুদ্ধ ভাষার কাছাকাছি বলা যেতে পারে তবে একেবারে শুদ্ধ ভাষা কোনো জেলায় বলা হয়না, আঞ্চলিকতার ছোঁয়ায় দোষে দুষ্ট। আর সবচেয়ে শ্রুতিমধুর বলা হয় ময়মনসিংহ অঞ্চলের ভাষাকে। তারপর রাজশাহী এবং রংপুরের ভাষার স্থান। বিশেষ করে বাক্যের শেষে একটা সুন্দর মায়াবী টান থাকে! বর্তমান সময়ে টিভি নাটক ও সিনেমা গুলোতে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ভাষা প্রচলন দেখা যায়। শ্রুতিমধুর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ভাষাও এখন আধুনিক সভ্যতার সাংষ্কৃতিক কর্মকান্ড ও প্রচার-প্রকাশনার কারণে বিলুপ্তির পথে। তাই ময়মনসিংহ অঞ্ছলের ভাষাকে সংরক্ষনের জন্য ও আঞ্চলিকতায় ব্যপকহারে ব্যবহারের জন্য স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

ভাষা বিশ্লেষকেরা ময়মনসিংহ অঞ্চলকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করেছেন, পূর্ব ময়মনসিংহ এবং পশ্চিম ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর নিয়ে গঠিত পূর্ব ময়মনসিংহ, এবং ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও জামালপুর নিয়ে গঠিত পশ্চিম ময়মনসিংহ।

বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ফরিদ আহমেদ দুলাল তার বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকসংস্কৃতি সন্ধান গ্রন্থে উল্লেখ করেন ভাষার বিবেচনায় নেত্রকোনা কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের ভাষা সিলেটের সাথে মিল আছে, আবার কিছু অংশ কুমিল্লা, নরসিংদী, ঢাকার সাথে মিল আছে, তেমনি টাঙ্গাইলের সাথ মিল আছে উত্তরবঙ্গের ও ঢাকার।

ময়মনসিংহের প্রবাদ, প্রবচন, লোকগান,লোকছড়া, ধাধা- শিলুক, ইত্যাদি ঘাটাঘাটি করলে কয়েক হাজার আঞ্চলিক শব্দ খুজে পাওয়া যায়, যা প্রতিনিয়ত ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় ব্যাবহার হয়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এসব শব্দের ব্যাবহার অত্যাধিক, তবে সব মিলিয়ে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা উচ্চারণ ও ব্যাবহারে কিছু বিষয় লক্ষণীয় যা হলো, ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় মহাপ্রাণ ধ্বনির উচ্চারণ না হয়ে স্বল্পপ্রাণ ধ্বনি উচ্চারিত হয় যেমন ভাত>বাত, অভাব>অবাব, ঝড়>জর ইত্যাদি।

ময়মনসিংহের মানুষ শ,স,ষ, কে হ উচ্চারণ করে যেমন শালা>হালা, সাপ>হাপ, শুধুশুধু> হুদাহুদি, ষাড়>হার ইত্যাদি তবে কখনো হ কে অ কিংবা এ উচ্চারণ করে ডিমের হালি> ডিমের আলি, হনুমান>অনুমান, হঠাৎ >সটাৎ ইত্যাদি।

ময়মনসিংহের জামালপুর ও শেরপুর অঞ্চলের মানুষ র কে অ উচ্চারণ করে আবার র এর সাথে উ কার হলে উচ্চারণ করে রুউ যেমন রসুন>অসুন, রাজ্জাক>আজ্জাক।

টাঙ্গাইল অঞ্চলের মানুষ ল কে নিয়মিত ন উচ্চারণ করে বাক্য অনুযায়ী উদাহরণ হিসেবে “নাই দিয়া নাটিমাছ দিয়া নেটাপ্যকটা করছাল” এখানে লাটিমাছ>নাটিমাছ, লাউ>নাই, ল উচ্চারণে যেখানে ন উচ্চারিত হয়।

সাধারণ ময়মনসিংহর অঞ্চলে হ বর্ণের উচ্চারণে অ উচ্চারিত হয় তবে বিশেষ্য ও ক্রিয়াপদের উচ্চারণে শব্দের শেষে অতিরিক্ত অ ব্যাবহার হয় যেমন হাস>আস, হাটাহাটি>আডাআডি, হালের বলদ> আলের বলদা, মামা হাটে গেছেন>মামা আডে গেছুইন ইত্যাদি, এছাড়াও এই অঞ্চলে স্বরবর্ণে ও এর উচ্চারণ উ হয় যেমন চোর>চুর, সোনা>সুনা, দোকান>দোহান ইত্যাদি।

ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষার বিশেষত্য হলো এর টান, ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষার উচ্চারণের বানান লিখা গেলেও উচ্চারণের যে টান তা কেবল শুনেই উপলব্ধি করা যায় যা আমরা কয়কটি বাক্য দেখলেই বুঝতে পারব,“খা খা জলদি খেয়ে নে, খাবিনা তো এসেছিলি কেন?”> “কা কা জলদি কায়ালা, কাইত্যেনা ত্যে আইছিলি ক্যারে ত্যা?”

এভাবে আরো আছে যে “ওখানে দাড়িয়ে আছিস কেন? এদিকে আসতে পারস না?” > ওইনো খারুইয়া রইসছ ক্যা? এফায় আবার পাশ না?”
“গোছলে সময় বিরক্ত করিস না ঘাটে চুপচাপ বসে থাক, আমি ডুব দিয়ে আসি” > গুছুলের সম ত্যাক্ত করিছ না, গাডঅ বইয়া খালি কইচ পারিস না, সিদা অইয়া ব,আমি ডুব দিয়া উডি”।

ভাষার এমন প্রবণতায় ময়মনসিংহবে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলাটা অন্য অঞ্চলের মানুষের পক্ষে ততটা সহজ নয়, তবে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ভাষা ততটাও কঠিন না যে পড়ে এবং শুনে যে কেউ বুঝবেনা বরং সহজেই যা পড়ে এবং শুনে বুঝে নেয়া সম্ভব, আমাদের দেশে প্রমিত ভাষার পাশাপাশি উপভাষার প্রচলন ব্যাপক, প্রতিটি অঞ্চলেই উপভাষা প্রভাব বিস্তার করে রেখেছি কিন্তু উপভাষা মূলভাষার জন্য ক্ষতিকর না বিধায় উপভাষার চর্চা নিয়মিত লক্ষণীয় এবং তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্যেও গ্রহণ করা হয় নানান উদ্যোগ।

মূলত ভাষার শক্তি তার শব্দ ভান্ডারে, এবং তার সৌন্দর্য চলৎশক্তিতে হঠাৎ এবং প্রতিটি ভাষার অবস্থান স্বাতন্ত্র তেমনি ময়মনসিংহে আঞ্চলিক ভাষার শক্তি তার বহুমাত্রিকতায়, যেমন বাংলা ভাষার লাথি শব্দটি ময়মনসিংহে ব্যাবহার হয় লাত্তি, ভ্যাদা, উষ্টা, মুড়া চারটি অর্থে এখানে লাত্তি বলতে সাধারণ অর্থে লাথি যা ফুটবলে দেওয়া হয়, ভ্যাদা অর্থে পায়ের তলা দিয়ে লাথি, উষ্টা অর্থে পায়ের তালুর অগ্রভাগ দিয়ে আঘাত, মুড়া অর্থে পায়ের গোড়ালি দিয়ে আঘাত সুতরাং বুঝা যায় ময়মনসিংহের ভাষায় বহুমাত্রিকতা বিদ্ধমান আছে এবং যার জন্যেই বাংলা ভাষায় ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা একটি স্থান দখল করে আছে।

ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা শুধু মাত্র শব্দ বা বাক্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এতে আছে আঞ্চলিক ভাষার গান, কবিতা, ছড়া প্রবাদ, প্রচলন, নিম্মে আমি একেকে এসবের অংশভাগ উপস্থাপন করছি যাতে পাঠক ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা সম্পর্কে সাধারণ ধারণা নিতে পারে।

শব্দসম্ভার – এখন>অহন, বিষ্ময়কর > আচমকা, কচি >আবাত্তি, বাচ্চা >আবু, উপুর হওয়া > উন্দা, চন্দ্রগ্রহণ/সূর্যগ্রহণ > গন্না, গোবেচারা > গোবাইজ্জা, অস্থিরতা >ছইট, সন্তান জন্মের সাতদিন পর্যন্ত সময় > ছডি, তরকারি >ছালুন, থুথু >ছ্যাপ, পায়খানা > টাট্টি, কলাগাছ কিংবা নারিকেল ও সুপারি গাছের ডাল> ডাগগা, অসচেতন > তাবুদ্যা, ধানকাটা > দাওমারি, নাকের শ্লষ্মা >পেডা, অনুপস্থিত > বিগাইত, স্তন > বুনি, পেটের চর্বি > লুন্দি, তরকারির ঝোল > ছালুন ইত্যাদি বহু শব্দ ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় ব্যাবহার করা হয়।

শব্দের অর্থ ;
দুক্কু = আঘাত
বেতনা =ব্যাথা
পাও = পা
আত = হাত
হাগ = শাক
মইচ = মরিচ
গেরান =ঘ্রান
রাও= কথা
বুগলো = কাছে
দুরাফি = দূরে
বাতর = খেতের আইল
ওগার = মাচা (নিশ্চিত হওয়া
যায়নি)
ওখ = আখ
ভুইত্তা = বড়
আবুধুপু = বাচ্চা কাচ্চা /শিশু
(ত্রিশালের ভাষা)
ইছা মাছ = চিংড়ী
লাডি মাছ = টাকি মাছ
হাছুন= ঝাড়ু
মুখ করা= বকাদেয়া
আক করা= হাকরা
ভেড়াছেড়া লাগছে = ঝামেলা
লাগছে
রাওকরা= কথা বলা
বেক্কল /বেহল = বোকা
ওয়াফ = বন বিড়াল
হুইনগা দেহ = শুকে দেখা (ঘ্নান
শুকা)
কাহই= চিড়ুনি
উহুন= ওকুন
কোম্বালা = কখন
পরবাইত্তা খাওয়া = সেহেরি
খাওয়া
হাইঞ্জা = সন্ধা
বেয়াইন বেলা =সকাল
হিতান = ঘুমানোর সসময় যে দিকে
মাথা রাখা হয়
পইতান = যে দিকে পা রাখা হয়
টিক মাইরা বসে থাকা =চুপ থাকা
কুইচ্চা মুরগি =ডিম দেয়া শেষ
মুরগী
হেইবা যা = দূরে যা
ভুরাইয়া = পূর্ন করে
বেহেই =সবাই
হাতেকুতেও = কখনোই
দিরাং = দেরি
কিবা = কিভাবে
লুডা লইছে =???????এইডা কইতামনা
কইলে বুইজ্জাইলবাইন
চংগ = মই,
খেতা = কাথা,
পাংখা/বিছুন = পাখা,
গেলেস =গ্লাস,
থালি= থালা
বন্নি= বদনা
ফহির = ফকির
বাহে= বাপে
রইদ= রোদ
পাডি= ছাগী
মুইত্তা= পস্রাব করে
আইগ্গা দিছে= পায়খানা করে
দিছে
নেংরা = রশি
খরা= মুরগী রাখার
কাইচুন – কাইয়াম – খেয়েছেন খাব।
একখদা=ছি ছি
রান্দা=বিরক্ত করা।
গুয়ু = গরু,
দয়ি = দড়ি,
কাআ = কাড়া,
গায়ি = গাড়ি,
গুয়া = ঘোড়া,
টিপি = টিভি,
বাউ = জ্বাল,
ব ভাই = বড় ভাই,
হুলিশ = পুলিশ,
ডাহাইত = ডাকাত,
মইসিং = ময়মনসিংহ ।
বান্দই= বড় ভাই,
বুজি/বুজান= বড় বোন,
জার=শীত(ঠান্ডা),
বন্দ= ফসল চাষ করার জন্য বিশাল ফাঁকা জায়গা, ডেহা= গরু(পুরুষ),
হাঁড়=ষাঁর,
হুইংগা=ঘ্রাণ নিয়ে,
ছিনাই=তরকারীর চামচ,
বত্তা=ভর্তা(আলু ভর্তা),
ডেংগা=ডাটা,

আবার, বর্তমানে ভাষা দূষণের নতুন উপদ্রব অশ্লীল শব্দের ব্যবহার। এখন বিনোদন, আনন্দ বা হাসি-ঠাট্টা মানেই কতিপয় বিশেষ বর্গীয় শব্দের সাবলীল ব্যবহার। যেমন ফেসবুক-ট্রল ও ইউটিউবের কিছু বিনোদনধর্মী ভিডিওগুলো যেন বিকৃত শব্দের পাশাপাশি অশ্লীল ও নোংরা শব্দ ও গালাগালির সমাহার। ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় বিভিন্ন দার্শনিক, রসাত্মক ও কৌতুকপূর্ণ সংলাপের পাশাপাশি মানুষের প্রতি মানুষের সম্মাান ও মর্যাদা প্রকাশ পায়। তথ্য সূত্র-ময়মনসিংহ লাইভ