ময়মনসিংহে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত সহস্রাধিক, ৫ জনের মৃত্যু

ছবি মোঃকামাল

মো: কামাল (ময়মনসিংহ)::ময়মনসিংহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানিবাহিত ডায়রিয়া রোগ মহামারি আকার ধারন করেছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে সহস্রাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৫জন রোগী সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যুবরণ করেছেন বলেও একাধিক সূত্রে দাবি করেছে। নিহতরা হলেন, নগরীর কাচিঝুলি এলাকার মমতাজ বেগম, হামিদ উদ্দিন রোড এলাকার বাদশা মিয়া, সাহেব কোয়ার্টার এলাকার রওশন আরা খাতুন, পুলিশ লাইন্স এলাকার উম্মে কুলসুম ও রোকেয়া বেগম।

এ ঘটনায় তোলপাঁড় শুরু হয়েছে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনসহ জেলা ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরে। ঘটনার কারন অনুসন্ধানে সরেজমিনে কাজ করছেন দু’টি মেডিকেল টিম। ফলে গত ১১ই মার্চ সিটি কর্পোরেশনের সরবরাহকৃত পানি পরীক্ষার জন্য স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন করেন সংশ্লিষ্টরা। ওই পরীক্ষায় সিটি কর্পোরেশনের সরবরাহকৃত পানিতে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর ‘ফিক্যাল কলির্ফম’ নামক এক ধরনের ব্যকটেরিয়ার সন্ধান পাওয়া গেছে। এদিকে গবেষকদের ধারনা, ক্ষতিকর এ ব্যকটেরিয়ার কারনেই পানিবাহিত এ রোগের প্রকোপ সৃষ্টি হতে পারে।

এবিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ময়মনসিংহের অ লিক পরীক্ষাগারের সিনিয়র ক্যেমিষ্ট্র মো: আনিছুর রহমান খান জানান, সিটি কর্পোরেশনের চিঠি পেয়ে ওইদিনই নগরীর পুলিশ লাইন্স, গলগন্ডা, খাগডহর, কাচিঝুলি, কাশর, ঢোলাদিয়া সহ ১০টি স্পট থেকে নমুনা পানি সংগ্রহ করি। ওই পানি পরীক্ষার পর ঢোলাদিয়া ও কাচিঝুলি এলাকার পানিতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ‘ফিক্যাল কলির্ফম’ নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

পরীক্ষাগারের জুনিয়র ক্যেমিষ্ট্র শফিকুল ইসলাম জানান, সাধারনত পানিতে এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকার কথা নয়। তবে ধারনা করা হচ্ছে পানি সরবরাহ লাইনের লিকেজ থেকে ক্ষতিকর এ ব্যাকটেরিয়া পানিতে মিশে গেছে। এ সংক্রান্ত রির্পোট ইতিমধ্যে সিটি কর্পোরেশন কতৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে স্থানীয় সূর্যকান্ত (এসকে) হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. প্রজ্ঞানন্দ নাথ জানান, প্রতিদিন নগরীর নতুন নতুন এলাকার মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। উপজেলা থেকেও রোগী আসছে। তবে তা শহরের তুলনায় অনেক কম। বেশি আক্রান্ত এলাকাগুলো হলো নগরীর কাচিঝুলী, কাশর, তিনকোনা পুকুরপাড়, ঘুণ্টি, খাগডহর ও মালগুদাম।

তিনি আরও জানান, প্রতিদিন গড়ে অর্ধ শতাধিক বিভিন্ন বয়সী রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৫২২ পুরুষ ও ৪১৭ নারীসহ প্রায় সহস্রাধিক মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। তবে কী কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে তার কারণ এখনো জানা যায়নি।

ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আবদুর রব জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিষয়টি নজরে আসলে নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। এনিয়ে দুটি মেডিকেল টিম কাজ করছে। তবে ধারনা করা হচ্ছে, দূষিত পানি পান এবং গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার বা অন্য কোনো কারণে এ রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, বিষয়টি নিয়ে পানি এবং স্বাস্থ্য শাখার ৪টি টিম সরেজমিনে কাজ করছে। ইতিমধ্যে পানি পরীক্ষার রির্পোট হাতে পেয়েছি। যে দু’টি এলাকার পানিতে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে ওইসব এলাকাবাসীকে সরবরাহকৃত পানি পান না করার জন্য সচেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচারণা চলছে।

নগরীর একাধিক ভূক্তভুগীরা জানান, সিটি কর্পোরেশনের দুষিত পানি পান করার কারনেই ডায়রিয়ায় রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক সময়ে ড্রেনের ময়লা পানির চেয়েও খারাপ পানি আসে সিটি কর্পোরেশনের সরবরাহকৃত লাইন থেকে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের বার বার জানিয়েও কোন প্রতিকার পাইনি।

তবে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের পানি বিভাগের প্রকৌশলী জিল্লুর রহমান জানান, পানির সমস্যা নিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোন ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, যারা মারা গেছে তাদের মধ্যে একজন ক্যান্সার এবং আরেক জন অন্য রোগে আক্রান্ত ছিল। কিন্তু একটি মহল সিটি কর্পোরেশনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য পানি নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. ইকরামুল হক টিটু বলেন, সরবরাহকৃত পানিতে কোন সমস্যা আছে কিনা, তা তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে। তবে সিটি কর্পোরেশনের পানি গৃহস্থালি কাজের জন্য সরবরাহ করা হয়। এটা সেইফ ওয়াটার না। এ পানি পান করতে হলে ফুটিয়ে নিতে হবে। এনিয়ে বিভ্রান্ত হবার কিছু নেই। যদিও একটি মহল বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্ত ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে বিষয়টি নিয়ে একাধিক মেডিকেল টিম কাজ করছে। কারন অনুসন্ধানে অবশ্যই দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও সিটি প্রশাসক জানিয়েছেন।