মাফিয়া জগতের কিংবদন্তী গডফাদার নটোরিয়াস আল কাপোন

আরিফ মাহমুদ::মাফিয়া জগতের কিংবদন্তী গডফাদার ছিলেন নটোরিয়াস আল কাপোন। ৪৮ বছর বয়সে ৩৩ জন গ্যাং লীডার খুন করে যিনি শিকাগো শহরের একচ্ছত্র অধিপতি হন ১৯৩০ সালের দিকে। যার জীবন কাহিনী নিয়ে হলিওডের দুনিয়া কাঁপানো ম্যুভি ‘স্কারফেইস’, ”আনটাচেবল” সহ ২১ টি চলচিত্র এবং ১৮ টি টিভি ড্রামা নির্মিত হয়।

আল কাপোন ঘোষণা করেন- আকাশের মেঘে হয়তোবা শিকল পরানো যেতেও পারে। কিন্তু তাকে আটকানোর সাধ্য কারো নেই। যে বা যারা সে চেষ্টা করবে-তাকেই মেঘের রাজ্যে পাঠানো হবে। আল কাপোন সমস্ত প্রশাসন, পুলিশ, লইয়ার, কোর্ট, কাচারী নিজের কব্জাবন্দী করে মূলতঃ তিনিই শিকাগোর অলিখিত মেয়র, ইলিনয়ের গভর্ণর বনে যান।

মাফিয়া সম্রাট আল কাপুনের সমস্ত কুকর্মের শাস্তি থেকে বাঁচানোর বিশ্বস্ত উকিল ছিলেন ইজি ইডি। ইজি ইডি বুদ্ধি, মেধা, বিচক্ষণতা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, যুক্তির পারদর্শিতার জন্য আমেরিকার বিখ্যাত এ্যাটর্নীদের অন্যতম। যেকোনো কেইসকে তিনি এমনভাবে ম্যানিপুলেট করে দিতেন-যাতে কোর্টের রায় তার পক্ষে না এসে উপায় ছিলোনা। হার্ভার্ড ল স্কুলে তার যুক্তি-তর্ক, আর্গুমেন্টের নানা মারপ্যাচের কিচ্ছা কাহিনী ছাত্রদের পড়িয়ে দুঁদে উকিল বানানোর কৌশল শেখানো হয়।

কোর্টের ক্ষেত্রে জাজদের কাছেই সবসময় উকিলরা তটস্ত থাকতেন। কিন্তু ইজি ইডির সামনে জাজরা না আসতে পারলেই যেন মুক্তি পেতেন। জাজরা জানতেন আসামী দাগী ক্রিমিনাল। কিন্তু বিরোধী পক্ষের লইয়ার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করতে না পেরে বারবার ইজি ইডির কাছে হেরে যেতেন। ফলে, ক্রিমিনালরা রক্ষা পেতো, ভালো মানুষগুলো ফেঁসে যেতো। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে জাজদের রায় লেখার যন্ত্রণা তাদের মনোকষ্টের কারণ হতো।

ইজি ইডি একবার মামলা জিতে ঘরে ফিরে দেখেন তার ছেলেটি গ্যাং বায়োলেন্সে খুব মারাত্মকভাবে স্ট্যাবড। শিকাগোর সমস্ত বিখ্যাত ডাক্তাররা উপস্থিত হয়েছে। মামলা-মোকাদ্দমা নিয়ে মিঃ ইডি এতো বেশি ব্যস্ত ছিলেন-সন্তান কীসে জড়িয়ে গেছে সেটা খেয়ালই রাখেননি। ধন-সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।

মানুষ যেখানে বাচ্চাদের খেলনা গাড়ি, খেলনা প্লেন উপহার দেয়- ইজি ইডি সন্তানদের ব্যক্তিগত প্লেন উপহার দিয়েছেন। বাড়ীর পরিবর্তে দিয়েছেন ম্যানশান। সুইমিং পুলের পরিবর্তে দিয়েছেন পুরো লেক । শিকাগো শহরে মাইলের পর মাইল দামি অট্টালিকার মালিক হয়েছেন। কিন্তু এসব কিছুই তার সন্তানকে বাঁচাতে পারলোনা। চারদিকে ডাক্তাররা দাঁড়িয়ে। নিজের কোলে তার মৃত সন্তান।

ইজি ইডি উপলব্ধি করলেন- অর্থ হলেই কিনতে পাওয়া যায় এমন সব কিছুই তিনি তার সন্তানদের দিয়েছেন- সম্পদ, ধন -দৌলত,বিলাসিতা সব। কিন্তু পিতা হিসাবে সন্তানদের যে আদর্শ, যে সততা, যে নৈতিকতার শিক্ষা দেয়া দরকার ছিলো তিনি তার এককণাও দিতে পারেন নি। একজন সন্তান তার পিতার জন্য যে কারণে গর্বিত হতে পারে এমন আদর্শ থেকে তিনি পুত্রদের বন্চিত করেছেন। নীতিভ্রষ্ট পিতার সন্তান নীতিবান হবে কেমন করে। এই পুত্রের মৃত্যুতে ইজি ইডি সম্পূর্ণ বদলে গেলেন। তিনি তার সন্তানদের জন্য এক নতুন লিগেসি রেখে যাওয়ার জন্য মৃত সন্তানের মাথা ছুঁয়ে শপথ নিলেন।

ইজি ইডি মাফিয়া কিং আল কাপুনকে বললেন- তিনি আর তার সাথে নাই। শুধু তাই নয়। তিনি তার সমস্ত পাপের প্রায়শ্চিত্য করবেন। আল কাপুন সহ সব মাফিয়া-গ্যাং লীডারদের কাঠগড়ায় ওঠাবেন। ইজি ইডি একের পর এক মামলা জিততে লাগলেন। ছোট, মাঝারি গ্যং লীডার, ধর্ষকরা একে একে কারাগারে যেতে লাগলো। ইজি ইডির বিরুদ্ধে আল কাপুন মৃত্যু পরোয়ানা জারি করলেন। ইজি ইডি বুঝলেন- যে কোনো সময় যে কোনো মুহুর্তে তিনি মারা যাবেন।

এটা জেনেও তিনি হার না মানা লড়াই করলেন। নতুন করে কাপুনের মামলা কোর্টে ওঠালেন। ৩৩ মার্ডারের আসামী আল কাপুনের বিরুদ্ধে ফেডারেল ট্যাক্স ফ্রডের জন্য সাজা হলো। আমেরিকার ম্যাক্সমাম সিকিউরিটির ফেডারেল প্রিজন আলকাতরাজে আল কাপুনকে চালান করে দেয়া হয়। কিন্তু মামলা জিতে ইডির আর ঘরে ফিরা হলোনা। গাড়ী চালিয়ে বাড়ি ফিরার পথেই আঠারোটি বুলেট তাকে বিদ্ধ করে। ইজি ইডি গাড়িতেই মারা যান। ইডির ২য় পুত্র ইডির শেষকৃত্য সম্পাদন করে পিতার কফিন কবরে নামিয়ে ঘরে ফিরে আসে।

২য় বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। আমেরিকার বিমান বাহিনীর এক চৌকষ অফিসার ইউএসএস লেক্সিংটন ব্যাটলশিপে তার দায়িত্বে নিয়োজিত। বেটলশীপ থেকে তিনি এফফোরএফ ওয়াইল্ড ক্যাট ফাইটার নিয়ে আকাশে উড়েন। হঠাৎ তিনি খেয়াল করেন- তার ফুয়েল ট্যাংক পুরোপুরি ভর্তি হয়নি। যার ট্যাংক ভর্তি করার কথা ছিলো সে হয়তো ভুলবশত তা ভর্তি করেনি।

ঠিক এমনি মুহুর্তে তিনি আরো দেখেন নয়টি জাপানী বম্বারস প্যাসিফিকে অবস্থান রত আমেরিকার লেক্সিংটন ব্যাটলশীপের দিকে খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে। ঠিক ঠিক ভাবে বম্বিং করতে পারলেই যে কোনো মহুর্তেই যুদ্ধবিমান বহনরত জাহাজ পানিতে ডুবে যাবে। হাজারো মানুষ ব্যাটলশীপের ওপরে রয়েছে। তারা হয়তো জানেইনা কি ভয়াবহ বিপদ তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। চোখের সামনে যেন ঘটতে যাচ্ছে আরেকটি পার্ল হারবার।

গ্রামমেনের ককপিটে বসা পাইলট বুঝলেন তিনি মারা যাবেন। তারপরও একাই জাপানী নয়টি বম্বারসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে- খুবই দক্ষতার সাথে দুটি জাপানী যুদ্ধবিমানকে ভূপাতিতে করেন। বাকি সাতটি বিমানের সাথে বিভিন্ন ডাইরেকশন পাল্টিয়ে জীবন বাজি রেখে লড়ে যান। তার একজনের মৃত্যুর বিনিময়ে যেন হাজারো মানুষ বেঁচে যায়।

বেটলশীপ অক্ষত থাকে। বাকি সাতটির মধ্যে আরো তিনটি জাপানী বিমান বিধ্বস্ত হলো। বাকি চারটিকে খুবই ক্ষিপ্রতার সাথে বিভিন্ন এ্যংগেল থেকে চার্জ করলেন। জাপানী পাইলটরা মনে করলো- এই লোক সম্পূর্ণরুপে উন্মাদ হয়ে গেছে। এখন যত দ্রুত পারা যায়- পালিয়ে যাওয়াই মঙ্গল। মোট পাঁচটি জাপানি বম্বারসকে শুট ডাউন করে তিনি নিরাপদে ব্যাটলশীপে ফিরেন।

তার এই অসাধারণ বীরত্বের জন্য ইউএস এয়ার ফোর্সের মাঝে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি বিমান বাহিনীর সর্বোচ্চ পুরষ্কার “কংগ্রেশনাল মেডেল অফ অনার” লাভ করেন। গ্রেটেস্ট হিরোর মর্যাদায় ভূষিত হওয়া এই ব্যক্তির নাম হলো বোচ ওহারে এবং তাঁর নাম অনুসারেই পৃথিবীর একটি বিখ্যাত এয়ার পোর্টের নাম- “ওহারে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট”-যেটি আমেরিকার শিকাগোতে অবস্থিত।

কিন্তু সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ঘটনা হলো – এই ওহারে হলো মাফিয়া সম্রাট আল কাপুনের গ্যাংদের হাতে খুন হওয়া বিখ্যাত লইয়ার ইজি ইডির পুত্র। যিনি সম্পদের লোভ ভুলে গিয়ে ন্যায়ের পক্ষে সোচ্চার হয়ে মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। বাপ জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন- সৎ আদর্শের মৃত্যু নেই। আর তারই আরেক সন্তান বড় হয়ে বাপের লিগেসিকে আমেরিকার ইতিহাসে নতুন মহীমায় চির ভাস্বর করে রেখে যান।