প্রতিবেশীদের সাথে ভারতের সম্পর্কের চরম অবনতি যে কারণে

শুধু চীন নয়, প্রতিবেশী আরও বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্কের চরম অবনতি হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তো দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ। চীনের সঙ্গেও সীমান্ত নিয়ে আগে থেকেই মতবিরোধ ছিল। তবে এখনকার মতো এতটা খারাপ হয়নি দেশ দুটির সাথে ভারতের সম্পর্খ।

শুধু চীন বা পাকিস্তান নয়, নেপালের মতো বন্ধু রাষ্ট্রের সঙ্গে-ও ভারতের তিক্ততা চরমে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে দেশটির বিদেশ নীতি নিয়েই।

ভারত-নেপাল বিরোধ

সোমবার চীনের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়েছে। এ ঘটনার মাত্র একদিন পরই বুধবার নেপালের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সেদেশের নতুন ম্যানচিত্র সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়েছে। তবে নেপালের সাথে বিরোধের সূত্রপাত করেছিল ভারতই। গত ৮ মে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিপুলেখে একটি সড়কের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন।

ভারতের উত্তরাখণ্ড, চীনের তিব্বত আর নেপালের সীমানা যেখানে মিশেছে সেখানে হিমালয়ের একটি গিরিপথের নাম লিপুলেখ। ওই গিরিপথের দক্ষিণের ভূখণ্ডটি ‘কালাপানি’ নামে পরিচিত- যে এলাকাটি ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নেপাল তাদের অংশ বলে দাবি করে থাকে। এরপরই ওই নতুন মানচিত্র প্রকাশ নেপাল যা গত বুধবার দেশটির পার্লামেন্ট পাস হয়েছে।

নেপালের মতে, নতুন মানচিত্রের ভিত্তি হচ্ছে ১৮১৬ সালের সুগাউলি চুক্তি। কিন্তু ভারত সেই দাবি নাকচ করে দিয়ে আসছে।

ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর টানাপোড়েন নিয়ে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অশ্বিনী রায় বলেন, এই অঞ্চলের প্রতিটা দেশই বোঝে যে চীন-ভারত সম্পর্কের ওপরেই নির্ভর করছে তারা নিজেদের কতটা স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারবে।

তিনি মনে করেন চীনের সঙ্গে ভারতের বিরোধের সুযোগ নিয়েছে নেপাল। তার ভাষায়, ‘নেপাল এই সুযোগটা আগে থেকেই নিয়েছে। এখন আরও বেশি করে সুযোগের সদ্বব্যবহার করছে।’

তার মতে, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বৈদেশিক সম্পর্ক ভারতের থেকে অনেক উন্নত। তারা বেশ আগ্রাসী মনোভাব নিয়েই এই অঞ্চলে কাজ করে।

অশ্বিনী রায় মনে করেন, ‘তারই ফলশ্রুতি এখন দেখা যাচ্ছে নানা দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে। আমরা প্রকৃত অর্থেই নিজেদের জমি হারাচ্ছি।’

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক কাকলি সেনগুপ্ত বলেন, ‘ভারত উচ্চাকাঙ্ক্ষী, তবে চীন অনেক বেশি আগ্রাসী। যদি নেপালের নতুন মানচিত্র প্রকাশের ঘটনাটা দেখি, সেখানেও চীনের প্রভাব কাজ করে থাকতে পারে।’

বিশ্লেষকরা যেমন একদিকে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হওয়ার কথা বলছেন, তেমনই ভারতের অভ্যন্তরীন রাজনীতিকেও দোষ দিচ্ছেন নিকটতম প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতির জন্য।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ পার্থসারথি ঘোষ বলছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে বিদেশ নীতি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির খুব একটা বক্তব্য বা দূরদৃষ্টি লক্ষ্য করা যায়নি।

তিনি বলেন, ‘তিনি ২০১৪-র আগে বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, কিন্তু সে সবই ছিল তার সংগঠনের প্রচারের জন্য, হিন্দুত্ববাদের প্রচারের জন্য।’

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরেও মোদি বিদেশ নীতি সংক্রান্ত যা করেছেন, তারও বেশিরভাগটাই প্রচারসর্বস্ব। তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সব সার্ক দেশগুলির প্রধানদের আহ্বান জানালেন, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফও এলেন। কিন্তু কাজের কথা কিছু এগুলো না।

পার্থসারথি ঘোষ বলেন,‘তার পর থেকে তিনি যতবারই বিদেশ সফরে গেছেন, সেগুলো যত না সেই সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার জন্য, তার থেকে বেশি নিজের দেশের মানুষের কাছে প্রচারের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল বলেই আমার মনে হয়।’

এই সরকারের আমলেই বিশ্বের নানা রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে বহু বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল সহ পৃথিবীর নানা দেশে গেছেন, আলোচনা হয়েছে, চুক্তি হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো হয়নি।

মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে চীন সফর করেছেন পাঁচবার এবং ২০১৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর চীনা নেতার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে তার বৈঠক হয়েছে অন্তত ১৮ বার।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে ভারতে হিন্দু জাতিয়তাবাদের আগ্রাসনের কথাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রতিবেশীদের কাছে ভারতের সম্পর্কে একটা নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমন কল্যান লাহিড়ী বলেন, ‘যেসব আইন নানা সময়ে ভারতে পাশ করা হচ্ছে, সেগুলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ভালোভাবে নিচ্ছে না। আজকে বিশ্বায়নের যুগে উগ্র জাতীয়তাবাদ কিন্তু কখনই কাম্য নয়।’

‘আর ভারতের কাছে প্রতিবেশীরা এটা আশাও করে না। ভারত একটা সময়ে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে ছিল, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে – সেরকম একটা দেশের কাছে প্রতিবেশীরা এধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী আইন আশা করে না।’ বলছিলেন ইমন কল্যান লাহিড়ী।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসতে ভারতকে প্রতিটা দেশের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা চালাতে হবে। আর ভারতের সাধারণ মানুষ আর রাজনৈতিক নেতাদের একাংশ যে ‘যুদ্ধং দেহি’ মনোভাব নিয়ে চলতে শুরু করেছেন, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি মোদি সরকারকে সামরিক উপায়ে নয়, সমস্যার সমাধান করতে হবে কূটনীতিভাবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা