ত্রিশালে মাদকের ভয়াল থাবা, অভিযোগের তীর এমপি পুত্রের দিকে

ত্রিশালে মাদকের ভয়াল থাবা, অভিযোগের তীর এমপি পুত্রের দিকে

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত শিক্ষা ও শান্তির জনপদ ত্রিশাল । এখানকার সামাজিক পরিবেশ সৌহার্দ্যে ভরা। কিন্তু এই সৌহার্দ্যরে জনপদ এখন মাদকের কড়াল গ্রাসে পরিণত হয়েছে । এখানকার অধিকাংশ অপরাধের মূলেই রয়েছে মাদকের ভয়াল থাবা। মাদকের বিস্তারের প্রভাবে হিংস্র ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সংশ্লিষ্ট মাদক কারবারিরা।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে উপজেলা প্রশাসন, থানা প্রশাসন, জেলা পুলিশ সার্কেল, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানগণ, পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষ শক্ত অবস্থানে থাকার পরও নির্মূল হয়নি মাদক ।

সরেজমিনে ত্রিশাল ঘুরে পুলিশ, একাধিক রাজনীতিক, পেশাজীবী ও স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই অভিযোগ করেছেন ত্রিশালের এমপি ধর্মমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা রুহুল আমীন মাদানীর পুত্র ত্রিশাল উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হাসান মাহমুদ এই মাদক চক্রের নেপথ্যে কাজ করছেন।

অনেকের অভিযোগ, এমপির ছেলে হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন তিনি। ত্রিশালে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও অনৈতিক কর্মকান্ডের নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে অনেক সেক্টরেই হাসান মাহমুদ শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ত্রিশালের অধিকাংশ মানুষই হাসান মাহমুদের এসব অপকর্মের কথা জানলেও তারা প্রকাশ্যে ভয়ে মুখ খুলেন না। এমনকি জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের পদস্থ নেতারা এসবের বিরুদ্ধে গোপনে কথা বললেও স্থানীয় এমপি ও তার ছেলের ভয়ে সরাসরি বা স্পষ্টভাবে কথা বলতে সাহস পান না।

জানাগেছে, গত বছরের ডিসেম্বরে ত্রিশাল থানা পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে বীররামপুরের চিহ্নি মাদক কারবারি আব্দুল মান্নানকে আটক করে। এসময় অপরাপর মাদক কারবারিরা মান্নানকে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। এক সপ্তাহ পর কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি পুলিশ) অভিযান পরিচালনা করে কুমিল্লা থেকে ২৫শ’ ইয়াবাসহ তাকে আটক করে । ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবে মান্নান স্বীকার করে জানায়, ত্রিশাল ছাত্রলীগের শীর্ষ এক নেতার নির্দেশে এবং ব্যবস্থাপনায় কুমিল্লা থেকে ইয়াবা নিয়ে গিয়ে বীররামপুরে বিক্রি করি । বর্তমানে এই মাদক কারবারি কুমিল্লা কারাগারে আছে ।

অপরদিকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ ত্রিশালের ছাত্রলীগ নেতা মনিরুল ইসলাম রুবেলকে গোয়েন্দা সংস্থা ডিবি পুলিশ আটক করেছে । রাজধানী ঢাকার উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকা থেকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার মঠবাড়িয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মনিরুল ইসলামকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবার চালানসহ ডিবি পুলিশ তাকে আটক করে ।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, চলতি সপ্তাহে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে আনন্দ ভ্রমণে যায় ত্রিশাল উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতির নেতৃত্বে উপজেলার সকল পর্যায়ের ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ । এই ভ্রমণে মনিরুল ইসলাম রুবেলও অংশ নেয় । ২০ ফেব্রুয়ারি সেখান থেকে পাচারের উদ্দেশ্যে ৬ হাজার ৪শ’ ৫০ পিস ইয়াবার চালান নিয়ে ঢাকা হয়ে ত্রিশালের উদ্দেশ্যে আসছিল সে। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে গোপন সূত্রের ভিত্তিতে রাজধানী ঢাকার উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় মনিরুল ইসলাম রুবেলের গাড়িতে (বাসে) তল্লাশি এবং অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। এসময় ত্রিশালের ছাত্রলীগ নেতা মনিরুল ইসলাম রুবেলকে ৬ হাজার ৪শ’ ৫০ পিস ইয়াবাসহ হাতেনাতে আটক করে।

এঘটনায় ডিবি পুলিশ বাদী হয়ে মনিরুল ইসলাম রুবেলের বিরুদ্ধে হাতিরঝিল থানায় মামলা দায়ের করেছেন । মামলা নং- ২৭ । তাং- ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ । ধারা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ এর ৩৬ এর ১-১০(গ) । মনিরুল ইসলাম রুবেল ত্রিশালের মঠবাড়িয়ার বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেনের পুত্র বলে জানা গেছে ।

এব্যাপারে ডিবি পুলিশের কর্মরত কর্মকর্তাগণ জানান, অভিযানকালে ঘটনাস্থল থেকে অনেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় । তাদের কাছে আরও অনেক মাদক ও অস্ত্র ছিল । ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল স্বীকার করেছে যে, এই ইয়াবা চালাল হাসান মাহমুদের মদদে এবং নির্দেশে আনা হচ্ছিল ।

এদিকে ত্রিশাল ছাত্রলীগের মেয়াদোর্ত্তীণ কমিটি বিলুপ্ত করার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। স্থানীয় এমপি পুত্র ও ত্রিশাল উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হাসান মাহমুদের বিরুদ্ধে আগেও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। ৩ বছর আগে ডিবি পুলিশ তাকে মাদকসহ আটক করে । যদিও অজ্ঞাত কারণে সেসময় তাকে ছেড়ে দেয়া হয় । তবে এবার তিনি পুলিশের হাতে ইয়াবার একটি বড় চালানসহ নিজ অনুসারীসহ আটক হওয়ার পর ময়মনসিংহ জেলা কমিটিকে উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত করার নির্দেশ জারি করেছেন জয়-লেখক। গতকাল অনলাইন সংবাদপত্রে খবর প্রকাশের পর ত্রিশাল ছাত্রলীগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে ।

ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ছাত্রলীগে কোনো মাদকাসক্তরই ঠাঁই নেই। সেখানে মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক কিভাবে কমিটি পরিচালনা করেন তা নিয়েও প্রশ্ন উঠায় ত্রিশাল উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে। তারা এই নির্দেশ পালন না করলে আগামী দুই দিনের মধ্যে কেন্দ্র থেকে জেলা কমিটির বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানা গিয়েছে।

এব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি হাসান মাহমুদ জানান, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায় একটি মহল মিথ্যা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচার করছে।

তথ্যসূত্র: দৈনিক ভোরের পাতা, জার্নালিস্টভয়েস৭১.কমআমাদের কন্ঠ