ত্রিশালে ইয়াবার আড়ৎ ও হোম ডেলিভারি সার্ভিস

ত্রিশালে ইয়াবার আড়ৎ ও হোম ডেলিভারি সার্ভিস

বিশেষ প্রতিনিধি:: ইয়াবা নামক এ ভয়ংকর মাদকের কবলে পড়ে ধ্বংসের সাগরে অকালে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সম্ভবনাময়ী যুব সমাজ। ইয়াবা শব্দটি আমাদের সকলের কাছে অতি পরিচিত। শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত এবং আইনগত নিষিদ্ধ হলেও রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতার কারণে ইয়াবার আগ্রাসনরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। শাড়ির আঁচলে অসহায় মায়েরা অশ্রুতে চোখ মুছেন নীরবে। বাবার বুকে গভীর বেদনা- দীর্ঘশ্বাস। সন্তানকে নিয়ে দেখা বড় বড় স্বপ্ন এখন ইয়াবার কারণে দুঃস্বপ্ন হয়ে যাচ্ছে। তাই এ বিষয়ে যুব সমাজের জেগে উঠার কোন বিকল্প নেই।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইয়াবাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন: ইন্ডিয়াতে বলে ভুলভুলাইয়া, ফিলিপাইনে ও ইন্দোনেশিয়ায় বলে শাবু, উওর থাইল্যান্ডে এর নাম চাকোস, সাউথ আফ্রিকায় বলে টিংকু, ব্রাজিলে বলে বালা ইত্যাদি। বাংলাদেশে কোন কোন এলাকায় ইয়াবাকে ‘বাবা’ ও বলে। ইয়াবা তৈরী করা হয় ২৫-৩৫ মি: গ্রা: মেথামফেটামাইন ও ৪৫-৬৫ মি: গ্রা: ক্যাফেইন এর সংমিশ্রণে। কোনো কোনো সময় ১০-১৫% হেরোইন ও মিশিয়ে থাকে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, বাংলাদেশে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ, এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ইয়াবা আসক্ত।

অবিশ্বাস্য রকমভাবে ইয়াবার বিস্তার ঘটছে সারা দেশে। ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলাতেও এর ভয়াবহতা মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা নামলেই ত্রিশাল উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন আর পৌর এলাকার বিভিন্ন অলিগলিতে উঠতি বয়সের ছেলেপেলেরা যেখানেই জড়ো হচ্ছে সেখানেই চলছে ইয়াবা সরবরাহ। অভিযোগ রয়েছে, সন্ধা নামলেই ত্রিশাল উপজেলা পরিষদ চত্তর থেকে নজরুল বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পিছনে শ্বশান ঘাট পর্যন্ত বেশ কয়েক জায়গায় বসে মাদকের আড্ডা।

ত্রিশালে ইয়াবার পাইকারি ও খুচরা হাট বসে প্রতিদিনই। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আড়ৎ বালিপাড়া ও ধলায়! এখানে রেলস্টেশন থাকায় মাদকের ছড়াছড়ি বেশি। এছাড়া কালিরবাজার, রামপুর, বগারবাজার, সাইনবোর্ডসহ ত্রিশাল নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রতিদিন খুচরা ও পাইকারি দামে লাখ লাখ টাকার ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যে। এছাড়াও উপজেলার রামপুর ইউনিয়নে ইয়াবার বড় বড় বেশ কয়েকজন ডিলার রয়েছে, এইসব ডিলারদের কাছ থেকে প্রতিদিনই পাইকারি ও খুচরায় কোটি টাকার ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। এছাড়াও ত্রিশাল পৌরসভার ২ নাম্বার ওয়ার্ডে ইসলামী একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজের আশেপাশে ইয়াবার বড় এক ডিলার রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

বালিপাড়া, ধলা, কালিরবাজার এলাকা থেকে ময়মনসিংহের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে ইয়াবার বড় বড় চালান। আর এর জন্য ব্যাবহার করা হচ্ছে বালুর ট্রাক। ট্রাকগুলো সারারাত বালুভর্তি করে ময়মনসিংহের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় যায়, সেই বালু ভর্তি ট্রাকে বিশেষ ব্যাবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় ইয়াবার বড় বড় চালান। ভালুকা ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে মাদক সেবি ও বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানাযায়, বিগত বছর তিন ধরে পার্শবর্তী শিল্পনগরী ভালুকা ও ফুলবাড়িয়াতে পাইকারি দামে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা আসছে ত্রিশাল থেকে।

এছাড়াও প্রতিদিন পার্সেল যোগে ইয়াবার সাপ্লাই আসে ঢাকা থেকে। ঢাকা থেকে প্রতিদিনই দুরপাল্লার একটি বাসে ইয়াবার চালান নিয়ে দুপুর ২-৩ টার মধ্যে ভালুকার মাষ্টারবাড়ি, সিডস্টোর, ভালুকা সদর, ভরাডোবা ও ত্রিশাল হয়ে ময়মনসিংহ সদর পর্যন্ত ডেলিভারি দিয়ে যায়, আর এর জন্য আগেই বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দিতে হয়। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ভালুকার হাসপাতাল রোডের এক ব্যবসায়ি ব্যাংকে টিটি করে টাকা পাঠায় ত্রিশালের এক লোকের কাছে এবং ত্রিশাল থেকে ইয়াবা হোম ডেলিভারি দিয়ে যায় ঐ ব্যবসায়ীর কাছে।

শুধু পাইকারী না, ত্রিশাল উপজেলার প্রতিটা ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার প্রতিটা ওয়ার্ডে ইয়াবার সাব ডিলার রয়েছে। এইসব ডিলারদের নিয়ন্ত্রণে ১০-১২ জনের সেবক গ্রুপ থাকে যাদের কাজ হলো ইয়াবার জন্য খুচরা কাস্টমার ফোন দিলে তার বাসার ঠিকানা সংগ্রহ করে অর্ডার অনুযায়ী বাসায় পৌছে দেয়া। এমনকি অর্ডারকৃত ইয়াবা রিসিভ করার জন্য ঘরের বাইরেও আসতে হয়না, ডেলিভারি ম্যান জানালা দিয়েই (ক্যাশ অন ডেলিভারি) ইয়াবা পৌছে দেয় গ্রাহকের কাছে।

স্থানীয় সূত্রে জানাযায়, টেকনাফে যে দামে পাইকারী ইয়াবা বিক্রী হয় ত্রিশালেও সেই দামে ইয়াবা বিক্রী হয় আর তাই বৃহত্তর ময়মনসিংহের ইয়াবা ব্যাবসায়ীদের প্রথম পছন্দ ত্রিশালের ইয়াবার পাইকারী বাজার।

এক ভুক্তভোগী বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ ভয়াবহ মাদক ‘ইয়াবা’ নিয়ে সরকারসহ দেশবাসী উদ্বিগ্ন হলেইবা কি আসে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনে চলছে অলিগলিতে বেচাকেনা। এমন লাভজনক ব্যবসায় দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শেষ হলেইবা কি! এর বিরুদ্ধে কোথাও সাঁড়াশি অভিযান নেই। কারণ এটা বন্ধ হলেই যে বখরা বা চাঁদার মোটা অংক আদায় হবে না।

র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশা জানান, অবিশ্বাস্য রকমভাবে ইয়াবার বিস্তার ঘটছে সারা দেশে। প্রতি গলিতেই রয়েছে ইয়াবা ব্যবসায়ী। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, ইয়াবা সেবক ও ব্যবসায়ীর তালিকায় ডাক্তার-প্রকৌশলী থেকে শুরু করে দিনমজুর পর্যন্ত প্রায় সব পেশার মানুষই রয়েছেন। তবে এর নিয়ন্ত্রণে র‌্যাব সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।