ডাকসু নির্বাচনে ব্যবধান গড়বে সাধারন ছাত্র ছাত্রীদের ভোট

ডাকসু নির্বাচনে

দীর্ঘ ২৮ বছর পর অবশেষে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন।  হাতে মাত্র একদিন। আগামীকাল সোমবার সকাল ৮টায় শুরু হবে ভোটগ্রহণ। এই নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের আবহ। শেষ পর্যন্ত কারা জিতবে ইতোমধ্যে তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। তবে নির্বাচনের ফল নির্ধারণ হবে বেশ কিছু ফ্যাক্টের ওপর। একাধিক প্রার্থী ও শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায়, গত ১০ বছর ধরে ক্যাম্পাসে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে তারা খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ছাত্রলীগ জনপ্রিয়তা হারিয়েছে।

পাশাপাশি কোটা সংস্কারের জন্য গড়ে ওঠা প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের কাছে নেতিবাচক পরিচিতি পেয়েছে ছাত্রলীগ। আর অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর সংখ্যা এখন অনেক বেশি। ফলে কোটা আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ছাত্রীরাও। এ ছাড়া ১৮টি হলের ৪০ শতাংশ অনাবাসিক শিক্ষার্থী, টিএসসিভিত্তিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, আঞ্চলিক সংগঠনও ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ছাত্রলীগ সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ মনোনীত একটি হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সামগ্রিকভাবে আমরা এগিয়ে রয়েছি। ক্যাম্পাসে আমাদের সংগঠনের কর্মী ১০ হাজারেরও বেশি। সেদিক বিবেচনা করলে আমরা ভালো অবস্থানে রয়েছি। তবে ভোটের ফলতো শুধু আমাদের কর্মীদের ভোটে নির্ধারণ হবে না। এর জন্য অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

কোটা আন্দোলনকারীরা ভোটের ফলে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোটা আন্দোলনের ফলে তারাও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে মোটামুটি জনপ্রিয়। সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিক হাসান বলেন, জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা বড় ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি সত্যিকার অর্থেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য যারা কাজ করেছেন বিবেকবান ভোটাররা তাদের ভোট দেবেন। এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতিত হয়েও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেছেন বলে ভোটের ফলে বড় ফ্যাক্টর হবেন তারা।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, শুধু ভোটের ব্যবধান নয়, শীর্ষ পদে এই প্যানেলের প্রার্থীরাই নির্বাচিত হবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আনিসুর রহমান বলেন, গত বছর কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাদের নেতৃত্বে ঢাবিতে যে ছাত্রজোয়ার হয়েছে, তার রেশ রয়েছে এখনো। এই প্যানেলের নেতারাও ব্যক্তিগতভাবে এখন বেশ জনপ্রিয় ও খুবই সাধারণ পরিবারের সন্তান। ফলে তাদের জীবনাচারণও ভোটপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করবে। প্রায় একই কথা বলেন, মোতাহার হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী। তার দৃষ্টিতে শীর্ষ পদে জয়লাভ করবেন কোটা আন্দোলনকারীরা।চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, মোট ভোটার রয়েছেন ৪৩ হাজার ২৫৬ জন। এর মধ্যে ৬০ ভাগ আবাসিক ও ৪০ ভাগ অনাবাসিক।

হলগুলোর মধ্যে ১৩টি ছেলেদের আর পাঁচটি মেয়েদের। ছাত্রী হলগুলোতে আবাসিক-অনাবাসিক মিলে রয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী। হলে থাকেন ৯ হাজারের মতো, বাকি ছয় হাজার থাকেন হলের বাইরে। হলে থাকেন এমন ছাত্রীর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ প্রত্যক্ষভাবে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আর বাইরে থাকেন এমন ছাত্রীরা রাজনীতি করেন না বললেই চলে। সে হিসাবে ১৬ হাজার ছাত্রীর মধ্যে দেড় হাজারও সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। এ ছাড়া ১৩টি ছাত্র হলের আবাসিক-অনাবাসিক ২৯ হাজার ছাত্রের মধ্যে হলে থাকেন ১৫ হাজার। বাকি ১৪ হাজার থাকেন বাইরে। আবাসিক-অনাবাসিক মিলে বড়জোর ১০-১২ হাজার ছাত্র সরাসরি রাজনীতি করেন। বাকিরা রাজনীতি করেন না। ফলে বাইরে থাকা এসব শিক্ষার্থীর ভোট নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রাফিয়া ইসলাম বলেন, অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি। এ ছাড়াও ছাত্রীরা বেশ সচেতন। ফলে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রীদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।শামসুন্নাহার হলের অনাবাসিক শিক্ষার্থী রিতা খান বলেন, প্রায় ছয় হাজার অনাবাসিক শিক্ষার্থী ভোটের ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। এ ছাড়া টিএসসিভিত্তিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, আঞ্চলিক সংগঠনও ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করেন ভোটারদের বড় একটি অংশ। এসব সংগঠনের সাথে জড়িত এমন অন্তত সাত জনের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা বলেন, ভোটের ক্ষেত্রে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বেশ গুরুত্ব রাখবে। বিশেষ করে অঞ্চলভিত্তিক সংগঠনগুলো ফলের ব্যবধান ঘটাতে পারবে বলে আমরা মনে করি। ছাত্রদলের জিএস প্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক বলেন, হলগুলোতে দখলদারিত্বের রাজনীতি চলছে। আর এ অবস্থা থেকে মুক্তি চায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাই হলে রয়েছের এমন শিক্ষার্থীরাও ছাত্রলীগকে ছোট দেবেন না।

পাশাপাশি ছাত্রীদের কাছেও তারা অজনপ্রিয়। ছাত্রলীগকে ভোট না দিলেও শিক্ষার্থীরা কেন আপনাদের ভোট দেবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলোতে আমাদের সক্রিয় সমর্থন ছিল। আমরা ক্যাম্পাসের আবাসন সংকট, গবেষণায় টাকা বৃদ্ধি, বহিরাগত মুক্ত ক্যাম্পাসের জন্য কাজ করব। এ জন্য শিক্ষার্থীরা আমাদের ভোট দেবেন।এদিকে গতকাল শনিবার ছিল প্রচারণার শেষ দিন। ক্যাম্পাস সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় হলভিত্তিক প্রচারণা চালাতে দেখা যায় প্রার্থীদের। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি প্রার্থীরা দিয়েছেন নানা প্রতিশ্রুতি। জানতে চাইলে বামজোট মনোনীত ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী বলেন, ডাকসু নির্বাচনের জন্য আমরা আন্দোলন করেছি। শিক্ষার্থীদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তার প্রতিবাদ করার পাশাপাশি সবসময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলাম। তাই আমরা বিশ্বাস করতে চাই, সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমেদেরই ভোট দেবেন।

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ডাকসু নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী নুরুল হক নুর বলেন, আমরা কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আন্দোলন করেছি। নির্যাতনের শিকার হয়েছি। জেলও খাটতে হয়েছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানেন, আমরা তাদের জন্য কাজ করব। তাই তারা আমাদের ভোট দেবেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোট পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ছাত্রলীগ সমর্থিত এজিএস প্রার্থী সাদ্দাম হোসাইন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমাদের পরিবারের মতো। তাদের বিভিন্ন দাবি আদায়ে ছাত্রলীগ ভূমিকা রেখেছে। প্রশ্নফাঁস আন্দোলনে আমাদের দাবির মুখে আবার পরীক্ষা নিয়েছে। সুতরাং শিক্ষার্থীরা আমাদের ভোট দেবেন।