জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

 ত্রিশাল প্রতিদিন ডেস্কঃঃ   জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম ‘দুখু মিয়া’। বাবার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা খাতুন। বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তিনি বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সংগীত জগতকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।

১৯৭৬ সালে আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) মারা যান তিনি। কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

নজরুল এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মীয়। তাঁর বিচিত্র জীবনে স্থানীয় এক মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবেও ছিলেন তিনি।

১৯১১ সালে কবি নজরুল যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে কলকাতার মাথরুন স্কুলে পড়েন তখন মারাত্বক অর্থাভাবে পতিত হন তিনি। অর্থাভাব লাঘব করার জন্য তিনি রুটির দোকানে মাসিক এক টাকা বেতনে চাকরি নেন। টাকা এবং খাবার দেবে কিন্তু থাকার জায়গা দেবে না এই শর্তে কাজ নেন নজরুল। ফলে কোনও উপায় না দেখে নজরুল আসানসোলের রুটির দোকান সংলগ্ন একটি তিনতলা বাড়ির বারান্দায় সিড়ির নিচে রাত্রি যাপন করতেন। ওই বাড়িতেই থাকতেন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর কাজী রফিজ উল্লাহ।

 

রফিজ উল্লাহ সাহেবের বাড়ি ছিল ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার কাজীর শিমলা গ্রামে। কাজী সাহেব একদিন সিঁড়ির নিচে ঘুমন্ত নজরুলকে দেখে কৌতুহলী  হয়ে পড়েন এবং নজরুলের জীবন কাহিনী শুনেছিলেন।

রফিকুল ইসলামের লেখায় পাওয়া যায়, দারোগা সাহেব নাকি নজরুলকে পাঁচ টাকা বেতনে বাড়ির কাজে নিযুক্ত করেন কিশোর নজরুলকে। তখন পর্যন্ত দারোগা এবং তার স্ত্রী শামসুন্নেছা দম্পত্তি ছিলেন নিঃসন্তান। নজরুল দারোগাকে তাঁর পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। নজরুলের অনুরোধে আবেগাপ্লুত হয়ে কাজী সাহেব তার বড় ভাই কাজী সাখাওয়াতউল্লাহকে পত্রযোগে নজরুলকে ত্রিশালের কাজীর শিমলায় পাঠিয়ে দেন স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য। এভাবে নজরুলের আসানসোলের রুটির দোকান এবং কাজী রফিজউল্লাহের বাড়ির চাকরির সমাপ্তি ঘটে।

 

আলাউদ্দিন আল আজাদ এর লেখায় পাওয়া যায়, ১৯১৪ সালে কাজী রফিজউল্লাহ দারোগা নজরুলকে ভর্তি করানোর জন্য তাঁর পাশের বাড়ির ছেলে কাজী ইসমাইলের সাথে ময়মনসিংহের সিটি স্কুলে পাঠান। নজরুলের নাকি স্কুলটি পছন্দ হয়েছিল কিন্তু জায়গীর না পাওয়ায় ঐ স্কুলে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি নজরুলের। ঐ একই সালের জুন মাসে কাজী নজরুল ইসলাম ও ছোট ভাই কাজী আবুল হোসেন কে দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে (বর্তমানে নজরুল একাডেমি) ভর্তি করান দারোগা সাহেব। কাজী আবুল হোসেন আসানসোলে নজরুলের সহপাঠী ছিলেন। তাই তিনি ভর্তি হোন সনদপত্রের ভিত্তিতে আর নজরুল ভর্তি হোন টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে।

 

কাজীর শিমলা গ্রাম থেকে ত্রিশালের দরিরামপুরের দুরত্ব ছিল পাঁচ কিলোমিটার। এই পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হতো নজরুলকে স্কুলে ক্লাস করার জন্য। বর্ষাকালে রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ত। ফলে স্কুলে যাতায়াতে খুব কষ্ট হতো নজরুলের। এই অসুবিধা লাঘব করার জন্য দারোগা সাহেব ত্রিশালের নামাপাড়ায় তাঁর আত্মীয় কাজী হামিদুল্লাহের বাড়িতে জায়গীর রাখেন নজরুলকে।

বিভিন্ন লেখকের লেখা থেকে পাওয়া যায়, কাজীর শিমলায় নজরুল তিন মাস অবস্থান করেছেন। সেখানে অনেক স্বাধীনতা ছিল নজরুলের। কিন্তু জায়গীর বাড়িতে এতো স্বাধীনতা ছিল না। তাই নজরুল বাঁশি বাজানো, গান গাওয়া, রাস্তাঘাট, বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো, একটি বটগাছে চড়ে বাঁশি বাজানো ইত্যাদি করতেন। নজরুল তখন তেমন পড়াশুনা করতেন না। তাই নজরুলকে আশ্রয়হীন হতে হয়। পরে তিনি বিচুতিয়া বেপারীর বাড়িতে জায়গীর থাকেন। বেপারী বাড়ির পূর্ব দিকে একটি ছোট পুকুর ছিল। সেই পুকুরের পাড়ে একটি ছোট ছনের ঘর ছিল। সেই ঘরেই নজরুল থাকতেন। অবশ্য পুকুরটিতে নজরুল গোসল করতেন না। পাশের বাড়ির আরেকটা পরিষ্কার পানির পুকুরে তিনি গোসল করেছেন। বিচুতিয়া বেপারীর পুত্রবধু নজরুলকে খাওয়াতেন।

কবির স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়িতেই তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট “নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র”।

নজরুল ত্রিশালের নামাপাড়ায় শুকনিবিলের নিকটে যে বটগাছে চড়ে বাঁশি বাজাতেন সেই বটগাছের পাশেই শুকনিবিলের মাঝে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কবির নামে বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। নজরুলের সাহিত্যকর্মের ওপরে গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে “নজরুল ইন্সটিউট”।

 

অসংখ্য কবিতা ও গান রচনা করেন। আঠার বছর বয়সে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এক সময় তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। এ সময় তিনি রচনা করেন ‘ব্রিদ্রোহী’ ও ‘ভাঙার গান’ কবিতা। এক সময় তিনি জেলে বন্দি হন তখন লেখেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দি’।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের গান, কবিতা ও সাহিত্য কর্ম বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করে। লেখক হিসেবে তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ। জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে তাঁর লেখনি ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। তাঁর কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে।

দ্রোহের কবিতা লিখে তিনি যেমন হয়েছেন বিদ্রোহী কবি, তেমনি প্রেম আর সাম্যের বাণী শুনিয়ে হয়েছেন মানবতার কবি। অগ্নিঝরা লেখনি দিয়ে বাঙালি জাতিকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন কাজী নজরুল। মুছে ফেলতে চেয়েছেন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ। তাই তো সাম্প্রতিক বাস্তবতায়ও নজরুলের চিন্তা ও দর্শন খুব প্রাসঙ্গিক।

তাকে ভোলাও সম্ভব নয়। বাঙালিকে যে কবি মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলার জয়গান শুনিয়েছিলেন তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

 

 

বিদ্রোহ ছিলো তার প্রকাশে আর সাম্য ছিলো চেতনায়। শোষণহীন সমাজ ছিলো তার আরাধ্য। তিনি তার পংতিমালায় তুলে ধরেছেন নিপীড়িত মানুষের কথা।  নির্বাক কবিতায় বরাবরই উচ্চারিত হয়েছে মানবতার বাণী।

রাজনৈতিক বিদ্রোহটাকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সাহিত্যে নিয়ে এসেছিলেন নজরুল। অগ্নীবীণা হাতে তার প্রবেশ, ধুমকেতুর মতোই তার প্রকাশ।

প্রিয়ার ভালোবাসায়ও সিক্ত কবি রচনা করেছে প্রেমের জয়গান। পদ্য গদ্য, উপন্যাস, সঙ্গীত সাহিত্যের সব শাখায় তার আগমন ছিলো ধূমকেতুর মতো।

কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সঙ্গীত জগতকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন তিনি। প্রেম, দ্রোহ, সাম্যবাদ ও জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গান শোষণ-ব্ঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর কবিতা ও গান ছিল প্রেরণার উৎস।

পরিচিত এই অঞ্চলটি।কিন্তু আমরা লজ্জীত আমরা তার সঠিক মূ্ল্যায়ন আজো দিতে পারিনি। শুধু মুখে তাকে ধারন করলেও মনে নেই তার মত মূল্যবোধ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে সদ্য-স্বাধীন দেশে নিয়ে আসেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এদেশে তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করেন। ধানমন্ডিতে কবির জন্য একটি বাড়ি প্রদান করেন। মধ্য বয়সে বিদ্রোহী কবি রোগাক্রান্ত হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।