চিত্রশিল্পী ড. হীরা সোবাহানের জীবনকথা-(০১)

চিত্রশিল্পী ড. হীরা সোবাহান
চিত্রশিল্পী ড. হীরা সোবাহান

মোঃ আনিসুর রহমানঃ বাংলাদেশের বৃহত্তর জেলা ময়মনসিংহের এক সময়ের প্রাচীন জনপদ ছিলো মুক্তগাছা। যা মোঘল শাসনামলে আলাপসিং পরগণা হিসাবে পরিচিত ছিলো। এছাড়াও মুক্তাগাছার আদি নাম ছিলো বিনোদবাড়ী। ঐ সময় বগুড়া জেলার ঝাকর অঞ্চল থেকে চার ভাই যথাক্রমে রামরাম আচার্য চৌধুরী হররাম আচর্য চৌধুরী, বিষ্ণুরাম আচার্য চৌধুরী ও শিবরাম আচার্য চৌধুরী পিতার মৃত্যুর পর ফুলবাড়িয়া এলাকার শিবগঞ্জ ও মুক্তাগাছা বানারপাড় হয়ে আয়মান নদী দিয়ে (বর্তমান চৌরঙ্গীর মোড়ে) বজড়ায় আরোহণ করে রাজঘাটে যাত্রা বিরতি করেন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা বিনোদপুরের পরিবেশ ছিলো ফ্রেমে বাঁধানো ছবির মতো। এই সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে চার ভাই এখানেই রাজবাড়ী নির্মাণ করে শাসনকার্য পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। জমিদার শাসনামলে সাধারণত আগত জমিদারকে উপঢৌকন দিয়ে বরণ করে নেওয়ার রেওয়াজ প্রচলিত ছিলো। সে সময় মুক্তারাম কার্মকার নামক এক ব্যক্তি রাজার আগমনে নজরানা হিসেবে একটি গাছা (পিনাসুজ) উপহার হিসেবে রাজাকে প্রদান করেন। রাজা মহোদয় গাছার নিপুণ কারুকার্যে বিমোহিত হয়ে বিনোদবাড়ীর নাম পরিবর্তন করে মুক্তারামের মুক্তা আর তাকে উপহার দেওয়া গাছা একত্র করে নতুন নামকরণ করেন মুক্তাগাছা।

এই মুক্তাগাছা থানার পৌর এলাকাভুক্ত নন্দীবাড়ি নামক গ্রামে মুক্তাগাছা তথা ময়মনসিংহের কৃতীসন্তান গুণী শিল্পী ড. হীরা সোবাহান ২৪ মে ১৯৭০ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম মো. আবদুস সোবাহান হীরা। তবে তিনি ‘হীরা’ নামেই ব্যাপক পরিচিত। পিতা আলহাজ্ব ফয়জুর রহমান ছিলেন মুক্তাগাছা শহরের একজন বিশিষ্ট চালকল, পরিবহণ ও কাপড় ব্যবসায়ী। তিনি ছিলেন ধার্মিক, দীর্ঘ কয়েক বছর মুক্তাগাছা ছোট মসজিদ কমিটির সভাপতি, মুক্তাগাছা কাপড় বণিক সমিতির সভাপতি, মুক্তাগাছা বড় মসজিদ কমিটির সহ-সভাপতি এবং সমাজসেবক। মাতা করিমন নেসা ছিলেন একজন গৃহিণী ও দানশীল মর্হিষী নারী।

প্রাথমিক জীবন : ১৯৯০ সালের দিকে শিল্পী হীরা যখন হাতে লিখে ‘নবদিগন্ত’ নামক পত্রিকাটি প্রকাশ করেন তখন তার মা পত্রিকা অঙ্করণের জন্য রঙ, লেখার জন্য কলম এবং ফটোকপি করার জন্য দুইশত টাকা দিয়ে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন। পিতামহ গুল মাহমুদ ছিলেন একজন ধার্মিক ও মুক্তাগাছা ছোট মসজিদের স্বনামধন্য মোয়াজ্জেম। মাতামহী কিতাবজান বেওয়া ছিলেন একজন গৃহিণী। শিল্পী হীরা সোবাহান চার ভাই এক বোনের মধ্যে তৃতীয়। তিন ভাই মুক্তাগাছার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং বোন গৃহিণী। এই পরিবারিক পরিমণ্ডলে ড. হীরা সোবাহান বেড়ে উঠেন।

অবলোকন করেন পারিপার্শ্বিক প্রকৃতি, মানুষজন ও সমাজের চালচিত্র। বাল্যকাল থেকেই তার মধ্যে শিল্পচৈতন্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের দুর্যোগের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। যতটুকু তার মনে পড়ে তখন তার বয়স ছিলো আনুমানিক ৫/৬ বছর। সে সময় মাটির গর্তের ভিতর পরিবার পরিজনের সাথে লুকিয়ে থাকতেন। কখনো গ্রামের আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে লুকিয়ে থাকতেন পাক-হানাদার বাহিনীর অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য। নানা ধরনের খেলাধূলা করতেন এবং সময় পেলেই ঘরের মেঝে, দেয়ালে কয়লা বা চক দিয়ে আঁকিঝুকি করেছেন। কখনো মাটি দিয়ে তৈরি করেছেন নানা ধরনের জিনিস, আবার কখনো কাগজের ঘর, নৌকা তৈরি করেছেন। এমনিভাবে তার মধ্যে শিল্পভাবনা জন্ম লাভ করতে থাকে।

ক্লাস টু থেকে ফাইভ পর্যন্ত স্লেটে, কাগজের খাতায় বইয়ের পাতায় বইয়ের ছবি দেখে দেখে আঁকার চেষ্টা করছেন। কখনো বইয়ে ছাপা চিত্রের উপর পাতলা জাতীয় কাগজ রেখে কলম দিয়ে ট্রেসিং করতেন। কখনো কাপড়ের রুমালে সুঁচ দিয়ে নকসা তুলতেন। মূলত ক্লাশ সিক্স থেকে তার মধ্যে লক্ষ্য করা যায় ক্যালিগ্রাফি চর্চার প্রবণতা। স্কুলের খাতায় কালিকলম দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইনে অক্ষর বিন্যাস করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এ সময় মুক্তগাছা কিশলয় কচিকঁাচার মেলার সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সুবাদে ছবি আঁকার প্রতি তার ঝোক আরো বেড়ে যায়। বিভিন্ন চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন এবং অনেক পুরস্কার অর্জন করেন। এ সময় ট্রাক গাড়ীর পেছনে ও রিক্সার পিছনে বিভিন্ন ধরনের সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ছবি এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য পথিমধ্যে অবলোকন করতেন।

এবং বাড়িতে এসে কাগজ পটে বাজার থেকে গুড়ো রঙ কিনে ও মাথার চুল কেটে পাটকাঠির সাথে সুতা দিয়ে বেঁধে তুলি বানিয়ে ছবি আঁকতেন। পাখি পোষা তার এক ধরনের সখ ছিলো। নবম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত অবস্থায় তার এক বন্ধুর অনুরোধে ট্রাকের পিছনের ঢালায় দুটি মোরগ চিত্রায়ণ করেছিলন। এই দুটি মোরগ আকিয়ে তিনি একশত টাকা পেয়েছিলেন। মূলত এটিই ছিলো তার জীবনের প্রথম রোজগার। বিভিন্ন সময়ে প্যাকটিক্যাল খাতায় চিত্র অঙ্কন করে দিতেন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের। নিতান্তই সখের বশে। আর এভাবেই তঁার মধ্যে শিল্প প্রতিভার স্ফুরণ ঘটতে থাকে। ধর্মীয় শাসনের মধ্যে বেড়ে উঠলেও ছবি আঁকার ক্ষেত্রে পরিবারের সকলেই তাকে প্রেরণা যুগিয়েছিলেন। শিক্ষাজীবন : মুক্তাগাছা কেন্দ্রিয় পৌর প্রাথমিক সরকারি মডেল স্কুল থেকে প্রাথমিক শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮১ সালে মুক্তাগাছা ‘আর কে মডেল হাই স্কুল’ ভর্তি হন। এখান থেকে ১৯৮৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন ঢাকা বোর্ডের অধীনে।

এই স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাজসজ্জার কাজও তিনি সম্পাদান করতেন। স্কাউটিং এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এরপর ১৯৮৬ সালে মুক্তাগাছা শহীদ স্মৃতি সরকারি মহাবিদ্যালয়-এ এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে ঢাকা বোর্ডের অধীনে ১৯৮৮ সালে হাইয়ার সেকেন্ড ডিভিশনে উত্তীর্ণ হন। এই কলেজেও রোভার স্কাউটের সদস্য ছিলেন। এখানে উল্লেখ্য কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলা অনুষ্ঠানের সার্বিক সাজসজ্জার কার্যাদি তিনি কলেজের অধ্যক্ষের আহবানে সম্পাদন করতেন। কলেজের অধ্যক্ষ শামসুল ইসলামের সাথে তার প্রায়শই চিত্রকলা বিষয়ে আলোচনা হতো।

কলেজের অধ্যক্ষ সর্বদা তাকে আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে প্রেরণা জোগাতেন। মূলত স্যারের অনুপ্রেরণায় তিনি আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার মনোস্থির করেন। তৎকালে চারুকলা ইনস্টিটিউট -এ এসএসসি সার্টিফিকেটের যোগ্যতায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ ছিলো। তবে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হতো। যদিও তিনি এইচএসসি পাশ করেছেন তথাপি তিনি এসএসসি সার্টিফিকেটে চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন করেন ১৯৮৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তিনি মুক্তগাছার অপর একজন বড়ভাই শিল্পী বিধূ ভূষণ সাহা, যিনি চারুকলা ইনস্টিটিউটে অধ্যয়ন করতেন, তার সাথে সাক্ষাৎ করে চারুকলায় ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করেন।

তিনি তাকে ঢাকার আর্ট হোস্টেলে তার কক্ষে থাকার সুবস্থা করে দেন। তখন কোচিং করার রীতি প্রচলিত ছিলো চারুকলায়। সাধারণত সিনিয়র ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা এটি পরিচালনা করতেন। এই কোচিং ভর্তি হয়ে যান তিনি। তবে কোচিং চলাকালীন দেশজুড়ে বন্যার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় কিছুদিনের জন্য কোচিং বন্ধহয়ে যায়। বন্যার প্রাদুর্ভাব শেষ হলে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন এবং কোচিং শুরু করেন। এরপর ভর্তি পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে প্রি-ডিগ্রি (প্রিলিমিনারি ডিগ্রি) তে ভর্তি হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। তিনি ১৯৮৯ সালের প্রথমদিকে ভর্তি হন। ক্লাশ শুরু হয় একই সালের ১১ মার্চে। ইতিপূর্বে যেভাবে তিনি ছবি আঁকতেন এখানে সেরকমটি নয়। এখানে প্রাণী বা বস্তুকে সারাসরি দেখে অঙ্কন রীতি শিক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করে চিত্রচর্চায় মনোনিবেশ করতে হয়। তিনি শিক্ষকদের সাহচার্যে প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিতে চিত্র রচনায় অন্বেষী হন। ১৯৯০ সালে প্রি-ডিগ্রিতে ২য় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে বিএফএ (ব্যাচেলর অব ফাইন আর্ট) শ্রেণিতে ছাপচিত্র বিভাগে ভর্তি হন। যদিও তিনি পেইন্টিং বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তথাপি তিনি ছাপচিত্র বিষয়কে নিবার্চন করেন। এ সময় এলাকায় আরেক শিল্পী ফারুক ভাই তাকে চিত্রাঙ্কনে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন।

তিনি এক সময় রাজশাহী আর্ট কলেজের ছাত্র ছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে বিএফএ সম্পন্ন করেন চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত। শিল্পী বিধূ ভূষণ সাহা বর্তমানে জামালপুরে সরকারি গার্লস হাই স্কুলে ড্রইং শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। এই দুজনের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিএফএ পর্যায়ে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন বিখ্যাত দুজন প্রবীণ শিক্ষককে। একজন হলেন শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ অপরজন আধুনিক ধারার শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া। এই দুজনের সান্নিধ্য লাভের সুযোগে তাঁদের কাছ থেকে ছাপচিত্রকলার নানা কলাকৌশল রপ্ত করে চিত্র নির্মাণে অন্নিষ্ট হন। বিশেষ করে শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া তার কাজের ধারা বেশি পছন্দ করতেন। সর্বদা তিনি এই ধারায় কাজ করে যেতে প্রণোদনা দিতেন। এছাড়া শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন শিল্পী মাহমুদুল হক, আবুল বারক্ আলভী ও রোকেয়া সুলতানাকে। এসব শিক্ষকদের সার্বিক সহযোগিতা তিনি সবসময় পেয়েছেন। ১৯৯৩ সালে বিএফএ ফাইনাল পরীক্ষায় ৫৯৫ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এখানে উল্লেখ যে ৫ নম্বরের জন্য তিনি প্রথম বিভাগ অর্জন করতে পারেননি। তবে এমএফএ (মাস্টার্স অব ফাইন আর্ট) পর্যায়ে তাঁর নিরীক্ষাধমর্মী শিল্পচেতনা প্রবলভাবে উৎকর্ষ অর্জন করে। এ পর্যায়ে তিনি বেশকিছু পুরস্কার অর্জন করতে সমর্থ হন। এ সময়ের তাঁর কাজের ঢেড় প্রশংসা করতেন শিক্ষকগণ।

তিনি মূলত এচিং, আকোয়াটিন্ট ও সফ্টগ্রাউন্ডের মিশ্রণ প্রকরণে বেশি শিল্পকর্ম নির্মাণ করেন। ১৯৯৫ সালের এমএফএ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০০০ সালে। এমএফএ পরীক্ষায় তিনি ৬১৪ নম্বর পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করতে সমর্থ হন। সর্বশেষ পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এবং তিনিই প্রথম ছাপচিত্র বিষয়ে বাংলাদেশে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। চলবে,,,