করোনা সংকট মোকাবিলার প্রত্যয়ে আজ আনন্দ ঘরে ঘরে

এবার বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে ভিন্ন আবহে আজ সোমবার ( ২৫ মে) পবিত্র ঈদুল ফিতর। যেখানে দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর দেশের মুসলমানরা ঈদের আনন্দে মেতে ওঠার কথা, সেখানে করোনা থেকে বাঁচতে এবার আনন্দ নিজ নিজ পরিবারে, বাড়িতে-বাড়িতে, ঘরে- ঘরে ।   মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর শত প্রতিকূলতা ও সংকট মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে  মনের শক্তি ও সাহস যোগাবে- এমন প্রত্যাশায় এবারের ঈদ আনন্দ ঈদগাহে হাতে হাত, বুকে বুক মিলিয়ে না হলেও মসজিদে মসজিদে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে পরস্পরের দেখা হওয়া, কুশল বিনিময় এবং আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের বাড়ি বাড়ি না গিয়ে মোবাইল ফোনসহ ভার্চুয়াল মাধ্যমে আনন্দ ভাগাভাগির মধ্যে দিয়ে পালিত হবে। সবাই সবার বাড়িতে থেকে  সবাই সবার মনের কাছাকাছি থাকায় নিজেদের একতাবদ্ধ থাকার প্রত্যয়ই ব্যক্ত হবে।
আর সকলের এই ঐক্যবদ্ধতায় মরণ ভাইরাস করোনা সঙ্কটের মোকাবিলা করে আবার ফিরবে স্বাভাবিত জীবনে।  ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন।  রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে ’ভিন্ন প্রেক্ষাপটে’ আসা ঈদ উদযাপনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নিজে ভালো থাকি-অন্যকে ভালো রাখি – এটাই হোক এবারের ঈদে সকলের প্রত্যাশা।”

ঈদ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে ‘অস্বাভাবিক পরিবেশের’ কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর লড়াইয়ে সামনের দিকে থাকা মানুষদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ”এই বিপদের সময় আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী, ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ যারা জীবন বাজি রেখে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”
শেখ হাসিনা বলেন, “অস্বাভাবিক পরিবেশে এবার ঈদুল ফিতর উদযাপন করছি। করোনাভাইরাস সমগ্র বিশ্বকে স্থবির করে দিয়েছে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এক অদৃশ্য ভাইরাস মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।”আমরা বাধ্য হচ্ছি নিজ নিজ অবস্থানে ধৈর্য্য সহকারে অবস্থান করতে যাতে অপরকে সংক্রমিত না করি বা নিজে সংক্রমিত না হই।”
সহনশীল ও সহানুভূতিশীল মনে একে অপরকে সাহায্য করার আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, “পাশাপাশি আমি করোনাভাইরাসের এই মহামারিতে অনুরোধ করব, যথাসম্ভব গণজমায়েত এড়িয়ে আমরা যেন ঘরে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করি এবং আল্লাহ্তায়ালার দরবারে বিশেষ দোয়া করি যেন এই সংক্রমণ থেকে আমরা সবাই দ্রুত মুক্তি পাই।”স্বাভাবিক সময়ে ঈদগাহে জামাত অনুষ্ঠিত হলেও এবার দেশের কোথাও ঈদগাহে জামাত অনুষ্ঠিত হবে না। জামাতের আয়োজন মসজিদে। নামাজ শেষে হাত মিলিয়ে মুসল্লিদের কোলাকুলিও হবে না। ধর্ম মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের জামাত মসজিদে আদায়ের এসব নির্দেশনা দিয়েছেন। এদিকে মন্ত্রাণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণের আহবান জানিয়েছেন আলেমরাও।
স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের নামাজের জামাত আদায় প্রসঙ্গে বিভিন্ন নির্দেশনা জারি করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে মুসল্লিদের জীবনের ঝুঁকি বিবেচনা করে ঈদগাহ বা খোলা জায়গার পরিবর্তে ঈদের নামাজের জামাত মসজিদে আদায় করতে হবে। প্রয়োজনে একই মসজিদে একাধিক জামায়াত অনুষ্ঠিত হবে। জামাত শেষে কোলাকুলি এবং পরস্পর হাত মেলানো পরিহার করার জন্যও অনুরোধ করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।
করোনার কারণে এবার হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত হচ্ছে না।  তার বদলে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পরপর পাঁচ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। মাস্ক ব্যবহার, দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ানো, জায়নামাজ বাসা থেকে নিয়ে আসা, নামাজ শেষে কোলাকুলি না করাসহ কিছু শর্ত পালন করে এসব জামাতে মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করতে পারবেন। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে, সকাল ৭টা, ৮টা, ৯টা, ১০ টা ও ১০টা ৪৫ মিনিটে । রাষ্ট্রপতি এবার বঙ্গভবনের মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করবেন।
দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাতের আয়োজন হয় কিশোরগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। করোনাভাইরাসের কারণে লাখ-লাখ মুসল্লি নিজেদের প্রিয় ঈদগাহে এবার নামাজ পড়তে পারছেন না। ঈদগাহের গ্র্যান্ড খতিব আল্লামা ফরীদউদ্দিন মাসঊদ বলেন, ‘করোনা মহামারির বিরুদ্ধে সারা মানবজাতি লড়াই করছে। আল্লাহর রহমতে এবারের ঈদে সারা মুসলিম জাহানের মানুষ এরথেকে মুক্তি পেতে দোয়া করবে। তবে, এবার আমাদের শোলাকিয়া ঈদগাহসহ দেশের অন্য ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়া যাবে না, নামাজ আদায় করতে হবে মসজিদে।’ঈদ জামাত প্রসঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আনিস মাহমুদ বলেন, জনস্বাস্থ্য বিবেচনা করে ঈদ জামাত নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মুসল্লিদের জীবনের ঝুঁকি বিবেচনা করে ঈদগাহ বা খোলা জায়গার পরিবর্তে মসজিদে নামাজ আদায়ের জন্য বলা হয়েছে। জায়গা না হলে প্রয়োজনে একই মসজিদে একাধিক জামাত করা যাবে।
আনিস মাহমুদ আরও বলেন, দেশের খ্যাতনামা আলেমদের সঙ্গে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলারও অনুরোধ জানান তিনি।
এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশও মুসল্লিদের ঈদের নামাজের বিধি নিষেধ মেনে চলতে আহবান জানিয়েছে। শুক্রবার (২২ মে) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, মহামারি করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সম্মানিত ধর্মপ্রাণ নাগরিকদের অনুরোধ জানাচ্ছে।
অন্যদিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় আরও বলা হয়, ঈদ জামাতের সময় মসজিদে কার্পেট বিছানো যাবে না। নামাজের পূর্বে সম্পূর্ণ মসজিদ জীবানুনাশক দ্বারা পরিষ্কার করতে হবে। মুসল্লিরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে জায়নামাজ নিয়ে আসবেন। মসজিদের প্রবেশদ্বারে হ্যান্ড স্যানিটাইজার/হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ সাবান-পানি রাখতে হবে। প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসা থেকে ওজু করে মসজিদে আসতে হবে এবং ওজু করার সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। ঈদের নামাজের জামাতে আগত মুসল্লিদের অবশ্যই মাস্ক পরে মসজিদে আসতে হবে। মসজিদে সংরক্ষিত জায়নামাজ ও টুপি ব্যবহার করা যাবে না। ঈদের নামাজ আদায়ের সময় কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে দাঁড়াতে হবে। এক কাতার অন্তর অন্তর কাতার করতে হবে। শিশু, বৃদ্ধ, যে কোনও অসুস্থ ব্যক্তি এবং অসুস্থদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি ঈদের নামাজের জামাতে অংশ নিতে পারবেন না।
নির্দেশনা মানা না হলে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেও জানান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আনিস মাহমুদ।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে এ নির্দেশনা সব জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। যাতে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
এদিকে সরকারের এ সিদ্ধান্তকে মেনে চলার আহবান জানিয়ে রাজধানীর লালবাগের জামিয়া কোরআনিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, ইসলাম মানুষের কল্যাণের কথা বলে। মানুষের জীবনের ঝুঁকি হ্রাস করতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে সরকার নির্দেশনা দিয়েছে। এ নির্দেশনা অনুসরণ করে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের নামাজ মসজিদে আদায় করলে শরিয়তের কোনও বিধানের খেলাপ হবে না।
জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, এমনিতেই আবহাওয়া খারাপ হলে ঈদগাহের পরিবর্তে মসজিদে নামাজ আদায় করা হয়। এ সময়ের আবহাওয়াও দুর্যোগপূর্ণ হওয়ার শঙ্কা আছে। ফলে করোনার কারণে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায়ে কোনও সমস্যা নেই। তিনি সবাইকে নির্দেশনা অনুসরণ করার আহবান জানান। দৈনিক আজকালের খবর