করোনাভাইরাস: জননেতা হওয়ার আগে জনসেবক হওয়াটা জরুরী

করোনাভাইরাস: জননেতা হওয়ার আগে জনসেবক হওয়াটা জরুরী

করোনা ভাইরাস। সারাবিশ্বে চষে বেড়ানো অদৃশ্য এক দানব। এই দানবের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এক একটা দেশের অর্থনীতি, চিকিৎসা ব্যাবস্থা, যোগাযোগ ব্যাবস্থা, সমাজ ব্যাবস্থা। খাঁচায় বন্ধি পশু পাখির মতো মানুষ আজ ঘর বন্ধি। হতদরিদ্র মানুষেরা আজ দিন কাটাচ্ছে খেয়ে/না খেয়ে, কখনও অভুক্ত।

আমাদের ত্রিশালে দুইটা লোকাল সাপ্তাহিক পত্রিকা আছে। সেই পত্রিকার বড় একটা অংশ বরাদ্ধ থাকে শুভেচ্ছা বাণী নামক ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের জন্য। বিভিন্ন দিবসের উছিলায় সেখানে প্রতি সপ্তাহেই কতশত নেতার দেখা পাওয়া যায়। তারা নিজেদেরকে ত্রিশাল উন্নয়নের রুপকার, জন দরদী, গরীবের বন্ধু, জনগনের সেবক ইত্যাদি পরিচয়ে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকেন।

কথায় আছে, অভাবের সময় প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় পাওয়া যায়। প্রতি সপ্তাহে সেই পত্রিকা দুটিতে কল্লা ছাপা হওয়া সেইসব নেতারা আজ কোথায় ? ত্রিশালে হাজার হাজার ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষ রয়েছে। লকডাউনের কারনে আজ সেইসব মানুষগুলি ঠিক ভাবে খেতে পারছে কিনা সেটা কি উনারা খোঁজ নিয়ে দেখেছে ?

লকডাউনের শুরু থেকে ত্রিশালের একজন নেতাকেই চোঁখে পড়েছে যে কিনা মানুষের বাড়ি বাড়ি ছুটে গিয়েছেন ব্যাক্তিগত তহবিল থেকে ত্রাণ নিয়ে, সেই সাথে মানুষকে করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন, বিতরণ করেছেন সুরক্ষা মাস্ক তিনি হলেন পৌর মেয়র আনিছুজ্জামান আনিছ। আমি অপেক্ষায় ও আশাবাদী ছিলাম যে, পত্রিকায় শুভেচ্ছা বাণী নামক বিজ্ঞাপন যারা যারা দেয় তারা সবাই রাস্তায় নেমে আসবে অসহায় মানুষগুলির পাশে দাঁড়ানোর জন্য। কিন্তু না। তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা।

আমাদের এমপি মাদানী সাহেব পবিত্র উমরাহ পালন শেষে সৌদি থেকে ফিরে এসে সেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। উনার কোয়ারান্টাইন শেষ হবার পর উনিও রাস্তায় নেমে এসেছেন। ব্যাক্তিগতভাবে ত্রাণও পৌছে দিচ্ছেন মানুষের ঘরে ঘরে। আমি আবারও আশাবাদী হয়ে উঠলাম। ভাবলাম বাকিরাও একে একে আসবে। পত্রিকার পাতায় ছাপা হওয়া মানুষরা সবাই নেমে আসবে রাস্তায়। কিন্তু নাহ!

উপজেলা চেয়ারম্যান মতিন সরকার সাহেবকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে বেশ কয়েক জায়গায় মানুষকে সচেতন করতে দেখা গেলেও এখন পর্যন্ত উনার ব্যাক্তিগত তহবিল থেকে কোন দানের খবর পেলাম না।

যাইহোক, উনারা বর্তমান জনপ্রতিনিধি। এটা উনাদের কর্তব্য। এটা উনাদের পালন করতেই হবে। কিন্তু ত্রিশালে আর নেতারা কোথায় ? জাতীয় বা পৌর বা উপজেলা নির্বাচনের সময় অতিথি পাখির মতো যাদের কিচিরমিচিরে মুখরিত! হয়ে উঠে ত্রিশালের বাজার। আজ কোথায় সেই ভাড়াটিয়া এমপি ? অথবা নমিনেশনের আশায় ঝাপিয়ে পড়া সেইসব বড় বড় নেতারা! ?

আমাদের ত্রিশালে কি অন্য কোন রাজনৈতিক দল বা দলের নেতারা নেই ? তারা আজ কোথায় ? কোথায় আজ ডা: লিটন সাহেব, জয়নাল আবেদীন সাহেব, শামিম সাহেব, আমিন সাহেবরা ? কোথায় আজ জাতীয় পার্টির নেতারা ? কোথায় আজ জামাতে ইসলামী অথবা ইসলামী ঐক্যজোটের নেতারা ? আপনারা কি হোম কোয়ারেন্টাইনে আটকে গিয়েছেন ?

আমাদের পাশের উপজেলা ভালুকার দিকে তাকান, দেখুন সেখানে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষেরা যার যার জায়গা থেকে অসহায় মানুষদের পাশে এসে দাড়িয়েছে। যার যার সামর্থ অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু নেতারা নয়, অসংখ্য সামাজিক সংগঠনও দাড়িয়েছে অসহায় মানুষদের পাশে। এদের দেখেওতো আপনাদের কোয়ারেন্টাইন (ঘুম) ভাঙ্গার কথা।

আজ আপনারা যদি নিজেদের কোয়ারেন্টাইন ভেঙ্গে বাইরে এসে অসহায় গরীব দু:খীদের পাশে না দাঁড়ান তাহলে একদিন আসবে যখন এই ত্রিশালবাসী আপনাদেরকে আজীবনের জন্য হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়ে দিবে।

আলহামদুলিল্লাহ! এমপি মাদানী সাহেব এবং মেয়র আনিছ সাহেব ঘোষনা দিয়েছেন যে ত্রিশালের একটা মানুষও না খেয়ে থাকবেনা। আমরা আপনাদের দুইজনের কথাই বিশ্বাস করতে চাই। আপনারা দুইজন যদি আপনাদের দেয়া কথা রাখেন তাহলে ত্রিশালে আর কোন নেতার প্রয়োজন নেই।

লিখাটার শুরুতে একটা ছবি দেয়া আছে। ছবিতে কি দেখতে পাচ্ছেন ? একজন লোক যার কিনা একটা পা নেই তিনি স্ট্রেচারে ভর করে অসহায় মানুষদের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন। যে লোকটা এই খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন উনার পরিচয় জানেন ? উনি একজন ভিক্ষুক। জ্বি, উনি ভিক্ষা করে যে টাকা জমিয়েছিলেন সেই টাকা থেকে উনার প্রতিবেশী মানুষদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন। অসহায় মানুষদের পাশে দাড়ানোর জন্য টাকা লাগেনা, লাগে সুন্দর একটা মন।

আরও একটা উদাহারণ দেয়ার লোভ সামলাতে পারছিনা। আমাদের ত্রিশাল প্রতিদিনের একজন স্টাফ রিপোর্টার আছেন পাশের উপজেলা ভালুকায়। উনার ব্যাক্তিগত একটা গ্যারেজ ছিলো যেখান থেকে উনার ভালো একটা উপার্জন হতো, কিন্তু লকডাউনের কারনে সেটা বন্ধ থাকায় উপার্জনও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। উনি এখন সমাজসেবা আর সাংবাদিকতা নিয়েই আছে। যারাই অসহায়দের সাহায্য করছে তাদেরকে উৎসাহিত করতে উনি তাদের নিউজ করছেন। এর মাঝে বেশ কয়েকজন খুশি হয়ে উনাকে কয়েক হাজার টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা নিয়ে উনি কি করেছেন জানেন ? সেই টাকা দিয়ে উনি খাদ্যসামগ্রী কিনে অসহায় গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছে। সেবা করার জন্য মনটাই বড়, এখানে টাকা কোন ব্যাপার না।

লেখাটা শেষ করার আগে আমি বিশেষ ভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান সাহেব ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) তরিকুল ইসলাম তুষার সাহেবকে। উনারা নিরলসভাবে ছুটে চলেছেন ত্রিশালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। স্ব-স্ব ঘরে অবস্থান নেওয়া হতদরিদ্র, দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষের জন্য সরকারকর্তৃক বরাদ্ধ ত্রাণ সামগ্রী নিজ হাতে বিলি করছেন। ত্রিশালের বিভিন্ন বাজারে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করছেন। কোন প্রকার অন্যায় দেখলেই মোবাইলকোর্ট বসিয়ে তাতক্ষনিক বিচার করে দিচ্ছেন। আপনাদের জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ।

পবিত্র কোরআনের কয়েকটা আয়াতের বাংলা তরজমা শেয়ার না করে পারছিনা:

১। সূরা আ’রাফ-৯৪ -ওর অধিবাসীদেরকে আমি দূঃখ, দারিদ্র্য রোগ-ব্যধি এবং অভাব-অনটন দ্বারা আক্রান্ত করে থাকি । উদ্দেশ্য হলো তারা যেন, নম্র এবং বিনয়ী হয় ।

২। সূরা মুদ্দাসসির-৩১ -তোমার “রবের” সেনাদল বা সেনাবাহিনী ( কত প্রকৃতির বা কত রূপের কিংবা কত ধরনের ) তা শুধু তিঁনিই জানেন ।

৩। সূরা ইউনুস-১৩ -অবশ্যই আমি তোমাদের পূর্বে বহু জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছি, যখন তারা সীমা অতিক্রম করেছিলো।

লেখক: জাকারীয়া খালিদ।
যুগ্ম সম্পাদক,
বাংলাদেশ লেখক-সাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশন, কাতার।