এ কেমন ডিপ্রেশন?

 রনি জামানঃঃ আমাদের ছোটবেলায় যখন কিছুমিছু খাইতে মন চাইতো,তখন আম্মা’র একটা কমন ডায়লগ হইতো; কি খাবি? পাতিল ভরা ভাত আছে,ভাত খা!

আর;এখন পোলাপাইন ক্ষিধা লাগলে ভাত খায় নাহ! ওরা ফুড পান্ডায় পিৎজা অর্ডার দেয়,পাস্তা বানায়,নুডলস খায়,চিকেন ফ্রাই করে অথবা বনরুটির ভিতরে লেটুস পাতা আর থেতলানো মুরগী’র মাংস দিয়া বার্গার বানায়।

তবু’ও নাকি এদের ডিপ্রেশনের শেষ নাই।ফেসবুক জুরে শুধু তাদের আবেগ,কষ্ট, আর ডিপ্রেশন।

আমরা বিনোদন বলতে রবিবারে র‍্যাভেন অথবা সায়মন,বুধবারে ম্যাগগাইভার আর শুক্রবারে দুপুরের পরে আলমগীর-শাবানা’র বাংলা সিনেমাকেই বুঝতাম।

আর এখন ওরা নেটফ্লিক্স,ইউটিউব,গুগল,ফেবু-ইন্সটা-লাইকি আর সিনেপ্লেক্সে ডিজিটাল ডলবি সাউন্ড সিস্টেমের হলিউদের লেটেস্ট সব মুভী দেখার সুযোগ পায়।

তবু’ও তাদের ডিপ্রেশনের নাকি শেষ নাই,তাদের নাকি কেউ বুঝেনা,জীবন’টা বেদনা সহ নানান ধরনের উপমা আর গদ্য-পদ্য ভরা স্ট্যাটাস দিয়ে ভার্চুয়াল লাইফ আর রিয়েল লাইফের সব কাহিনী ঢেলে দিচ্ছে।

স্কুলে দিয়া আব্বা বইলা আসছিলো পড়া না পারলে ওর মাংস রাইখা হাড্ডি’গুলা আমার জন্য পাঠায় দিবেন!এই কথা শোনার পরে ভয়ে শুধু নিজের পড়া’ই নাহ,পারলে আশপাশে অন্যদের’টাও মুখস্ত করে যাইতাম স্কুলে।

আর;এখনকার ছেলেমেয়ে’দের শাসন করলে নাকি সাসপেন্ড হইতে হয় স্কুল থেকে!যদিও কিছু শিক্ষকের’ও পদস্খলন হইছে এটাও সত্য কিন্তু;সেটা হাতে গোনা কয়েকজন’ই হবে।এসি ক্লাস রুম, গাড়িতে যাওয়া-আসা,টিফিন কিংবা ব্রেক’এ ভালো মানের খাবার পাওয়ার পরেও তারাই নাকি ডিপ্রেশড!

আমাদের জন্মদিনে একটা কেক কাটার যেই এক্সাইটমেন্ট ছিলো,বন্ধু কিংবা পাশের বাসার কাউকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানোর যেই ট্রেন্ড ছিলো,সেটা এখন বদলে ফেলেছে ওরা! ওরা কেক খায় না,বার্থডে বয় কিংবা গার্লকে কেক মাখায়।হাত গাছের সাথে বেধে বন্ধু’র মাথায় ডিম ভাঙে,মুখে ময়দা মাখায় দেয়!
প্রথম আলো’তে বেশ বড় করে ছাপা এই ছবি দেখে বুঝলাম এটাই নাকি এখন তাদের বার্থ ডে সেলিব্রেশনের ট্রেন্ড!

এতো মাখামাখি’র পরে আবারো তারা ডিপ্রেশড!
মানে সিরিয়াসলি!এরা আসলে কি চায়?হয়ত;নিজেও জানেনা।

ছোটবেলায় আম্মার হাতের ডাইলঘুটনী’র বারি আর স্যান্ডেলের বারি খেয়ে যারা বড় হইসে,আমি শিউড় ওসব ডিপ্রেশন নামের আলগা ভূত তারে জীবনে কোনোদিন ধরতে পারে নাই! সেই স্যান্ডেল,ঝারু কিংবা ডাইলঘুটনি’তে আলাদা ভাইটামিন আছে।

এখনকার পোলাপাইন আদর-আহ্লাদ-লুতুপুতু পাইতে পাইতে অভ্যাস্ত হয়া গেসে,তাই কেউ তারে ধমক দিলেও সে ডিপ্রেশনে চইলা যায়।হাত-পা কাটে,সুইসাইড এটেম্প করে,আরো নানান কাহিনী কিচ্ছা।

কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা ভিডিও দেখছিলাম।প্রত্যান্ত গ্রামাঞ্চলের এক কিশোর!পড়াশুনার জন্য তার ভেতরের হাহাকার দেখে ভেতরটা কেমন করে উঠছিলো।সে যখন বলছিলো; ঠীকমতো খাবার’ই ফারিনা,আমাগের আবার লেহাফড়া!দুইডা কামলা দিসি,হ্যাতেই বেলা শ্যাষ!স্কুল যামু কহন!ভালা জামা না ফইড়া গেলে স্যার ফিডায়।ক্ষেত-খোলায় কাম কইরা ভালা জামা কই ফামু!

কথাগুলিতে তীব্র অভিমান আর হতাশা ঝড়ে পড়ছিলো স্কুলে যেতে না পারার,পড়ালেখা করতে না পারার।আমি শিউড়,এদের কাছে ডিপ্রেশনের কোনো টাইম নাই।এদের কাছে দু’বেলা খেয়ে বেচে থাকার যুদ্ধে টিকে থাকাই জীবন।

গত শীতের এক সকালে গ্রীন রোডে গেলাম একটা কাজে,আমার গায়ে জ্যাকেট আর অন্য জামা থাকার পরেও সকালের হিমশীতল বাতাসে কাপন ধরিয়ে ফেলছিলো,হঠাৎ দেখলাম বাচ্চা একটা ছেলে হাতে পেয়ারা খাচ্ছে আর পরনে পাতলা ফিনফিনে একটা ফতুয়া! বাট;এই শীত যেনো তার গায়ে লাগছেই’ই নাহ!

ভাবলাম,আমাদের বাচ্চাদের এসময়ে কম্বল কিংবা লেপের নীচে ঢুকায় রাখার পরেও জ্বর-সর্দি-কাশি কমেই নাহ,অথচ বস্তি কিংবা রেললাইনের পাশে বেড়ে উঠা বাচ্চারা দিব্যি ভালো আছে! (তাদের প্রতি রেস্পেক্ট রেখেই বলছি)

কেন জানেন? আপনাদের অতিরিক্ত ভালোবাসা,লুতুপুতু আর আদর-আহ্লাদে বাচ্চাদের শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে কোনোটাই স্ট্রং হইতে দেন নাহ আপনারা।আর;তারাও অল্পতে ভেঙে পরে!সামান্য জ্বরে হসপিটালাইজড করতে হয়! ডিপ্রেশনে ভোগে।

সবকিছুর একটা লিমিটেশন থাকা চাই লাইফে।
আদর-আহ্লাদের সাথে শাসন নামের প্রয়োজনীয় ভাইটামিন’টা যদি থাকে সব সময়,তাইলে ডিপ্রেশান বা হতাশায় ভুগে জীবনের অপ্রাপ্তি কিংবা না প্রাপ্তির হিসাব কষবার আগে,প্রাপ্তি’টুকুর হিসেব’ও কষবে।

পোলাপাইন ডিপ্রেশনে থাকাটা’রে এখন একটা আর্ট বানায় ফেলসে।তাদের কাছে এটাও এখন একটা ট্রেন্ড হয়া দাড়াইসে।এই লেখা পড়ে যদি কেউ আবার ডিপ্রেশনে চলে যায়,তাইলে আমি দায়ী নাহ।

আম্মা জানলে আবার ডাইলঘুটনী চালান দিবো আমার উপ্রে!যাইগা বাজান।আইজ মরলে কাল দুইদিন,ডিপ্রেশনে যাওয়ার টাইম নাই।হুদাই ডিপ্রেশন লয়া লাইফ’টারে ধইঞ্চা বানায়া লাভ নাই কুনু!

আমার যখন ডিপ্রেশনের ভাব আসে,আমি তখন মজার মজার খাবারের ভিডিও দেখি আর মনে মনে ভাবি,এতো মজার মজার খাবার দেখার পরেও যে ডিপ্রেশড হয়, ওই লোক মনুষ্য প্রজাতির কলংক।

পেট ভইরা খাবারের চাইতে বড় সুখ,
এই দুইন্যায় আর দ্বীতিয়’টা নাই’রে বাজান😎