………..ঈদ হোক আনন্দময়………জাহিদুল ইসলাম ফয়সাল

ঈদের সকাল সর্বপ্রথম কলটা আসলো নিতুর ফোন থেকে । নিতু আমার প্রাক্তন প্রেমিকা । অনেকদিন যাবৎ তো আমার সাথে আর সম্পর্ক নেই। ঈদের দিন প্রায় সব মানুষরা এমন মানুষকে কল দেয় । যাদেরকে সাধারন দিনগুলোতে কল দেয় না । ৩০ টা রোযা রেখে রাতে না খেয়ে ঘুমিয়েছি মায়ের সাথে ঝগড়া করে । দীর্ঘ কিছুদিন যাবৎ আমি আমার বাবার সাথে কথা বলি না। ঝামেলা ওই একটা জিনিস নিয়েই , তা হলো টাকা । আমার বাবা কেমন যেন হাড় কিপ্টে মানুষ । সব কিছুতেই তিনি যেন কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব করেন। আমি কিছু বললেই আমাকে ওনার অতীতের ও কষ্টের সাথে পার করা দিন গুলোর কথা বলেন। আমরা অনেক গরীব ছিলাম।

ঠিক মতো খেতে পারতাম না। পড়াশোনা করার জন্য বাসা থেকে টাকা দিতো না আরও কত কি… বাবার এসব কথা শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। অথচ আমার বন্ধু বান্ধব কত টাকা নস্ট করে আনন্দ ফুর্তি করে। এসব দেখে আমার বড্ড খারাপ লাগে। কেন যে এই মধ্যবিত্তপরিবারে জন্মে ছিলাম। আম্মুর সাথেও টাকা নিয়েই ঝগড়া করে গতকাল রাতে খাওয়া হয় নি। বলেছিলাম ঈদে ঘুরাঘুরির জন্য ৩০০০টাকা দিতে । আমাকে মাত্র ১০০০টাকা দেওয়া হয়েছে। ১০০০ টাকা তো আজকে নিতুর সাথে দেখা করলেই শেষ হয়ে যাবে। ঈদের নামাজ আদায় করলাম বাসায় কোনরকম খাওয়া-দাওয়া করলাম না ।

আম্মু অনেক জোর করতে ছিল খাওয়ার জন্য । আমি চলে এসেছি নিতু আমার জন্য অপেক্ষা করছে মনে হয়। ঈদের দিন সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি রিকশাভাড়া প্রচন্ড বেশি চায়। কি আর করা বেশি দিয়েই যেতে হবে। আকাশের অবস্থা ভালো নেই। বৃষ্টি আসবে মনে হয় । নিতুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি আশ্চর্য হলাম । অসম্ভব সুন্দর লাগছে আজ তাকে । যেন বিয়ে করতে বউ এসেছে । দেখা করতে নয়। ও অনেক মিষ্টি স্বভাবের। সকালে আন্দাজ করেছিল আমি রেগে আছি। তাই মনে হয় আমার পছন্দের নীল রঙের শাড়ি পরে এসেছে সে । চোখে কাজল দিয়েছে, হাতের চুড়ি, চুলগুলো খোলা যেন মায়াবতী। আমরা রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করার সাথে সাথেই বৃস্টি শুরু হলো। একসাথে খাওয়া দাওয়া সম্পূর্ণ করলাম। ওর বাসায় নাকি অনেক মেহমান তাই ওকে যেতে হবে। আজকেও সে বিল দিতে চাইল কিন্তু আমিই দিলাম ।

আর কত নেওয়া যায় একটা মেয়ের কাছ থেকে? আমার পরিবারের অবস্থা খারাপ বলেই আমি ওর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি। মেয়েটা আমাকে প্রচন্ড রকম ভালোবাসে। বাসায় ফিরছি.. সুর্য অস্ত যাওয়ার পথে। লক্ষ করলাম রাস্তার পাশে একটা অসম্ভব সুন্দরী ছোট্ট মেয়ে কিছু কুৎসিত কাপড় পরা অবস্থায় । হাতে কিছু ফুল নিয়ে কান্না করছে। আমার মনে খুব মায়া জাগলো ‌ । কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম , আজকে তো ঈদ আর ঈদের দিন তুমি কান্না করছো কেন? মেয়েটি গরগর করে বলতে লাগল। আহা কি ভারি চমৎকার কন্ঠ। রমজানে কিছু ফিতরা ও যাকাতের টাকা পেয়েছিলাম । ভাবলাম ঈদের দিন ফুলের দাম বেশি থাকবে ।

এইদিন অনেকগুলা ফুল বিক্রি করতে পারব। কিন্তু আজ বৃষ্টি এসে গেছে তাই আর ফুল বিক্রি হয় নি । ফুল গুলো নষ্ট হয়ে গেলে আমার সবগুলো টাকায় নষ্ট হয়ে যাবে । আমার নাম রাইসা । আমিএকজন ফুল বিক্রেতা। বেশিদিন নয় এই ব্যবসা শুরু করেছি ,আজ ৩মাস হয়ে যাচ্ছে। আগে তার এটা ব্যবসা ছিলো না। কারন ব্যবসা করলে তো টাকা দরকার আর সে টাকা পাবো কই…..?? আগে আমার প্রধান ব্যবসা ছিল গাড়ীর জানালা জানালা হাত পেতে সাহায্য চাওয়া। সারাদিন গাড়ী গাড়ী সাহায্য চেয়ে যা পেতাম তা খাবার কিনে খেতেই শেষ। তাহলে টাকা জমাবো কিভাবে আর ব্যবসার মতো কাজই করবে কিভাবে…… তা তো কল্পনা। রাতে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার মতো। আমার বাবাও রাস্তার লোক। মানে এক অপরাদে জেলে আছেন । বাবা জেলের বাইরে থাকলে আমার ৩বার খাওয়া ও হয়না। কারন সাহায্য পাওয়া টাকা বাবা আমার কাছ থেকে নিয়ে হিরোয়েন কিনে যার জন্য টাকার অভাবে আমাকে না খেয়েই থাকতে হয়। আমার রাত কাটানোর জন্য বালিশ, কাথা, আর নরম বিছানার প্রয়োজন হয় না। কারন সারাদিন হাটাহাটির জন্য শরীর ক্লান্ত থাকে যার ফলে আমি শোয়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে যায়। ।কত সুখের জীবন।

না আছে কিছু চুরির ভয় আর না আছে ভবিষতের চিন্তা। একদিন সাহায্য চাওয়া অবস্থায় এক বড় লোকের গাড়ির সামনে হাত বাড়ায়। তখন ঐ ভদ্রলোক রাইসাকে জিঞ্জেস করে সারাদিনে কত টাকা পাও….??? সে বলল বেশি পেলে ১৫০ টাকা। ছেলে বলল এত কম টাকা দিয়ে কি করো…?? সে বলল ৩বার ভাত খায় মাঝে মাঝে টাকা না পেলে ক্ষুদার্থ পেটে ঘুমায় আগামী দিন পেট ভরে ভাত খাওয়ার আশ্বাস নিয়ে….. এই নেও আজ ভাত খাওয়ার ১৫০ টাকা আমি দিলাম। আর ৫০০ টাকা দিলাম কাল থেকে ফুল কিনে বিক্রি করবে। সাহায্য না চেয়ে ব্যবসা করবে….. ( ভদ্রলোক বললেন) রাইসা কান্না মাখা চোখে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। তার পর সে ভদ্রলোকের জন্য প্রতি সেকেন্ড যেন দোয়া করে আর আজ সে সেই টাকায় ফুলের ব্যবসা করে। ভাইয়া জানেন, ভাবছিলাম ঈদে বেশি ফুল কিনে ।

বেশি বিক্রি করলে ঈদের দুই তিন দিন খাবার নিয়ে চিন্তা করতে হবে না । আজকে বিক্রি হলো না ফুলগুলো । তাহলে তুমি কান্না করছো কেন? কালকে ফুলগুলো বিক্রি করিও। ঈদের সাত দিন পর্যন্ত ভালো দাম পাবে। ২৭ রমজানে আব্বু ছাড়া পেয়েছে জেল থেকে।ভাইয়া আব্বু বাসায় আসছে। আজকে আব্বুকে টাকা না দিতে পারলে আমাকে মারবে। সে ভয়েই আমি কান্না করছি । আমি মেয়েটাকে বেঁচে যাওয়া 200 টাকা দিয়ে। বাসার দিকে রওনা হলাম। আজকে নিজের প্রতি ঘৃনা হচ্ছে। এতো সুন্দর পরিবার তাও আমি আমার বাবা মার সাথে কত খারাপ ব্যবহার করেছি। চিৎকার করে বলতে লাগলাম আলহামদুলিল্লাহ আমি অনেক ভালো আছি। এখন রাইসার মনের বাণী হলো তুমরা আমার ফুল কিনে ফুলের ঘ্রান নেও আর আমাকে তুমাদের টাকা দিয়ে ভাতের ঘ্রান পেতে দাও………….লেখা :জাহিদুল ইসলাম ফয়সাল