আষাঢ়ের ফুল কদম

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রায় প্রত্যেকটি মানুষই ঘরকুনো হয়ে পড়ছে।এর মধ্যেই আষাঢ় মাসের আগমন। বহু যুগের ওপার থেকে ভেসে আসা স্মৃতি-সৌরভ। যেন গান হয়ে ভেসে ওঠে : বাদল দিনের প্রথম কদমফুল।

গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচেতে বড় বড় সবুজ পাতার ফাঁকে একেকটি কদমফুল ঝুলে থাকে।একটি ফুল যে কত ভাগে ভাগ করা আর সুঘ্রাণ। মূল বলটা হলুদ সোনালি রঙের, উপরিভাগে রয়েছে সাদা রঙের একটা প্রলেপ। বলে রাখা ভালো, আমরা যে গোল আকারের কদম ফুল দেখি সেটি কিন্তু একটিমাত্র ফুল নয়। অজস্র ফুলের সমারোহ।

এর ভেতরের মাংসলপিণ্ড থেকে হলুদ রঙের নলাকৃতির হাজার হাজার ফুল বেরিয়ে এসে বলটাকে স্পঞ্জ বানিয়ে রাখে। ওপরের সাদার প্রলেপগুলো অজস্র ফুলের পরাগকেশ। বলতে পারেন, হাজার ফুলের সমন্বয়ে এটি একটি ফুল। কদমফুলের ঘ্রাণ তীব্র নয়। তবে চার পাশ মদির করে রাখতে পারে। বড় নষ্টলজিক সেই ঘ্রাণ। যে কাউকেই মোহময় করে তুলতে পারে।

বৃষ্টির আড়ালে হালকা বাতাসে কদম ফুল দোলা দেখে গ্রামীণ প্রকৃতির রুপ ফুটে উঠে।
কদমগাছের পাতা বেশি হলেও পাতার ফাঁকে উজ্জ্বল আকর্ষণীয় কদমফুল দূর থেকে চোখে পড়ে। কদমফুলকে বলা হয় বর্ষার দূত। এর কারণ, কদমফুল মূলত বর্ষার ফুল হলেও ফোটা শুরু করে জ্যৈষ্ঠের শেষ দিক থেকেই। কদম ছাড়া আমাদের বর্ষা বেমানান। অসম্পূর্ণ। আষাঢ় মাসেই এ ফুলের সমারোহ হয় বেশি। কদম ছাড়া আষাঢ় যেন কল্পনাই করা যায় না। কদম না ফুটলে যেন বৃষ্টি ঝরে না।
কদমফুলের নজরকাড়া সৌন্দর্য এবং এর সৌরভ যুগে যুগে বাঙালিকে মুগ্ধ করেছে। এই ফুল পথিককে উদাস করে। গ্রাম্য বালিকাকে চঞ্চল করে তোলে।

এ কদমফুল নারী প্রেম কতটা তীব্র হতে পারে বাংলা সাহিত্যে তার বহু নিদর্শন রয়েছে। মধ্যযুগের পুরো বৈষ্ণব সাহিত্য রাধা-কৃষ্ণের বিরহ বেদনা মোহিত হয়ে আছে কদমের সুরভিতে।

এই কদম ফুল কে কেন্দ্র করে কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ, এবং কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কদমফুল নিয়ে অসংখ্য গান কবিতা লিখেছেন।

গাছের কাণ্ড সরল, উন্নত, ধূসর থেকে প্রায় কালো এবং বহু ফাটলে রূক্ষ, কর্কশ। শীতে সব পাতা ঝরে যায়। বসন্তে কচিপাতা আসে উচ্ছ্বাস নিয়ে।প্রস্ফুটন মওসুমে ছোট ছোট ডালের আগায় একক কলি আসে গোল হয়ে। বর্ষাকালেই মূলত ফুল ফোটে। তবে জৈষ্ঠ্যের শেষ দিকে অনেক গাছে ফুল ফোটা শুরু হয়। গাছের ছাল, কাণ্ড, পাতা, ফল, ফুল, ফুলের রেণু ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

উল্লেখ্য, এই কদম ফুল আজ প্রায় বিলীন এর পথে গ্রাম বাংলায় চোখে পড়ে না আগের মতো কদম ফুল গাছ।ব্যাক্তিগত ভাবে এর সংরক্ষণ না করার জন্য এই রকম হচ্ছে। বর্ণে গন্ধে সৌন্দর্যে কদম এ দেশের রূপসী তরুর অন্যতম হলেও অবহেলা-অনাদরে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এ গাছ। এক সময় তো কদমগাছ ছাড়া কোনো গ্রাম আছে এটা কল্পনাই করা যেত না। এখন দশ গ্রাম ঘুরেও কদমের দেখা পাওয়া যায় না। বলা যায় না অবহেলায় একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে এই গাছটা। তখন হয়তো কদম ছাড়াই বর্ষা উদযাপন করতে হবে আমাদের। তাই প্রয়োজন সচেতনতা। প্রকৃতির ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে অন্য গাছের পাশাপাশি কদমগাছ রোপণ করা প্রয়োজন।এখন বৃক্ষরোপণ এর সময় সকলে এই ঐতিহ্য কে রক্ষা করতে এগিয়ে আসা উচিত, নয়তো পরবর্তী প্রজন্ম শুধু বই কিংবা অনলাইনেই পড়বে দেখবে,বাস্তবে পাবে না।

লেখকঃমো ফাহাদ বিন সাঈদ
শিক্ষার্থী-ফিল্ম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ,
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।