আজকের কবিতা” তিন ভূবনের ঘর”

আসিফ ইকবাল আরিফ সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
আসিফ ইকবাল আরিফ সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

তিন ভূবনের ঘর

তিন ভূবনের তিন ঘর
ঘর নয় তো রে খেলাঘর।
এই ঘরে কেউ সুখে বর
কেউ বা শুনায় দু:খের স্বর।

প্রথম ঘরে শূন্যে ভাসি
পানি আর বায়ুতে সাঁতার কাটি।
মায়ের জঠরে দিবানিশি
ধীরে ধীরে বাড়তে থাকি।
ঐ ঘর থেকেই পরের দু’ঘরে।
এক ঘরে বসত করে
আর এক ঘরে দিই যে পাড়ি।
রূপ বদলায়ে, বেশ পাল্টায়ে
চলতে থাকে জীবন ঘড়ি।
এই ঘর বড্ড রহস্যে ভরা
কেউ জানেনা কূল কিনারা।
কেউ বলে সব স্রষ্টা জানে,
আবার হুবড়ি খেয়ে জীববিজ্ঞান
কত কিছু যে অনুমান করে।

তা! লোকে যে যাই বলুক
আমার প্রথম ঘরের স্পন্দন
পরের দু’ঘরেরই এক ঘরের।
মায়ের জঠরে বাবার বীর্য
সেই তো এই দ্বিতীয় ঘরেরই পণ্য।

মায়ের পেটে আমি দিব্যি একলা
মা ছাড়া কোনো সঙ্গী ছিলোনা।
আমার সাথে যারা বাড়তে চাচ্ছিলো
মায়ের গর্ভাশয় যাওয়ার আগেই
আমাকে মা বেছে নিলো।

সেই ঘর আমার খারাপ ছিলোনা
আহার নিহারের ছিলোনা ভাবনা।
মায়ের রক্ত খেয়ে খেয়ে
আমি পেতাম কূল কিনারা।
আমি মায়ের মন বুঝতে পারতাম
মায়ের সাথে কথা বলতাম
মায়ের সাথে খেলা করতাম
আমি সেখানে পা ছুড়তাম।
এইভাবে আমি বাড়তে লাগলাম
নিজের খেয়াল আর খুশির ছলে।
ওমা! ক’দিন বাদে দেখি আমার
খেলার জায়গা চুপসে গেছে।
জায়গা যেই ছোট হলো
সেই জায়গা আমাকে ছাড়তে হলো।
এই ঘর ছাড়ার রাত আর দিন নেই
বের হতে হয় লজ্জা না মেনেই।
সেই ঘরের সেই বাসিন্দা আমি
এলাম পরের ঘরে।
পরের ঘরে যে বিশাল জায়গা
দম নেওয়া যায় প্রাণ খুলে।

এই ঘরেরই মধ্যে আছে আরও কয়েক ঘর
ইতরকাল-শিশুকাল আর কৈশরেরই কাল।
যৌবন কালের সাথে আবার
আছে পৌঢ়ের জাল।
পরের ঘরে এসে দেখি হলো কত রূপ!
রূপের ভারে মাতায় খেলা
হয়ে কত উৎসুক!

জন্মের পর থেকে প্রায় প্রথম দুইমাস
তখন তা আমার নবজাতকের কাল।
তখন আমি বড্ড ইতর
ক্ষুধা আর নিদ্রায় থাকি বিভোর
আমি তখন যুদ্ধ করি
মায়ের দুধেই বাড়তে থাকি।
আমার আরাম আমি করি
মায়ের কোলে প্রসাব করি।
আমার যত দায়ভার
মায়ের দেহ থেকেই করি পার।
এরপর থেকে প্রায়ই দুই বছর
আমার হলো শিশুকাল।
এইসময়েও মায়ের কোল
আমার কাছে বড় আদরের আচল।
আমার যখন ছয়মাস হয়
তখন মুখে প্রথম অন্ন যায়।
খাবার নয় যেনো তেনো
খাবারের বিচার আছে কত!
যখন আমি বসতে শিখি
মায়ের মুখে কত হাসি!
আবার আমার যখন দাঁত ওঠে
দুধ পানে কামড়ায় মায়ের স্তনে।
মায়ের চোখ আসে জল
তবুও আমার খেলা চলে অবিরল।
যখন আমি হাঁটতে শিখি
মায়ের থাকেনা হুশ আরতি।
আমায় নিয়ে সারাবেলা
মায়ের মন চিন্তায় ভরা।
দুই বছরের পর থেকে
দশ কি এগারো বছর হবে
এই সময় আমার শৈশবকাল।
এই সময়ে ভাষা শিখি
তামাম দুনিয়া চিনতে থাকি।

এরপর আসে কৈশরের কাল
কত নতুন চিন্তার হয় উৎপাত।
দেহের সাথে সাথে বুদ্ধি বাড়ে
নিজের পরিচয়ের অস্তির খোঁজে।
এই সময়ে শিখি কত
রঙ বেরঙের খেলা।
খেলার শেষে ভেবে নাই পাই
কোনো কূল কিনারা।

এই ঘরেরই পরে আসে
আমার যৌবনের কাল।
এইকালেতে সংসার মেলে
নিজের জগত ফুলবাগানে
সাজিয়ে আপন মনে।
এই খেলা যে চলে দীর্ঘ কাল।

ঘর সাজাই, সংসার সাজাই
পাই যে এক ভূবন।
যে ভূবনে আমিই রাজা
আর না হয় কারো ধারধারা
নিজের মতই নিজেকে চালাই
সাথে সেই সংসারের হাল বয়ে যাই।
এই সময়ে পেশা খুঁজি
আয় রোজগার আর পুঁজি।
রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি,
আর জীবিকার নীতি
কত নীতির বুলি যে আমি বেঁচি।
কত কিছু করে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াই
এইসব নিয়ে বলতে গেলে তার যে শেষ নাই।
এই কালেতে লাভের হিসাব
লোকসানের থেকে বেশি
তাইতোরে ভাই বদলে স্বভাব
করি লাভের পাল্লা ভারী।
বহন করি জীবিকার তরী
গড়ে তুলি আমার শিশু।

যৌবন কালের হিসেব মিলিয়ে
যখন একটু আরামে বসি
শরীরটা যে দুমড়ে আসে
পৌঢ়ের দুয়ারে বসি।
সংসারের হাল দিয়েছি তুলে
আমার প্রজন্মের হাতে
প্রজন্ম যে নিজের না
একথা আর না মন মানে।

আপন আপন করে আমি
যাদের গড়লাম হাতে।
তাদেরও যে জগত আছে
এই কথা কী মিছে?
আসমান জমিন এক করার সাধ
আর আমার মনে নেই।
একটু সুযোগ পেলে আমি
চোখ তুলি আকাশেই।
মাটির কাছে মিলিয়ে হাত
কেঁদে ভাসায় বুক
এই ঘর আর ভালো লাগেনা
ধরেছে আমার পরের ঘরে যাবার অসুখ।
পরের ঘরে খেলব রেখে
রক্ত মাংসের দেহ।
আত্মাটা যে উড়ে বেড়াবে
বাতাসের সাথে মিশে
দেখবে না আর কেহ।

জনমকাল আর বড়ন কাল
হলাম আমি মানুষের ঘাড়ে পার
শেষকালেতেও উপায় নেই
মানুষেই করবে পার।
কেউ আমায় গোসল করাবে
কেউ পরাবে শেষ কাপড়।
সাজসজ্জায় সেজে আমি
উঠবো কাঁধের উপর।

তিন ভূবনে তিনঘর আমার
আমি খেলার তরী
কত স্মৃতি যে বয়ে বেড়ায়
মিছে যে, সব খেলারই সাথী।

আসিফ ইকবাল আরিফ
সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাককানইবি, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।